PAINTINGS:JACKSON POLLOCK

অমিত দে

মাধুকরী

তোমাকে ছায়ায় বসতে দিইনি
এই ভাল         এই সমাচার, 
দু’পাশের ডানায় রঙিন নেশা
মধু খুঁজে আলতো হাসি ছড়ায়
 
তোমাকে আমি অকালে 
                   কুড়িয়েছি
জীর্ণ থলি   রাখা দায় 
 
যেই মেঘ নামে অনিশ্চিত
সাঁতরে পেরিয়ে যাও
এক বর্ষার যত আলাপ, 
শরীরের আমন্ত্রণে
বুনো গন্ধ রাখি
ধার দেনা হাত পেতে নিই 
শূন্যতার কাছে থাকে যদি
ভুল কিছু অবিশ্বাস!     
 
মুদ্রিত নয় এমন চোখ
আমার সতেজ ঘাম লিখে রাখে — 
অশেষ বাঁচার অঙ্গীকারে 
হোক না অশান্ত  
              রুদ্ধ এই শ্বাস। 

সৌরভ লায়েক

উৎসব হোক আমাদের

বুকের ভেতর একটা আস্ত গ্রাম পুষে রেখো ।
যদি কেউ বৃষ্টি হয়ে আসে 
 
দেখবে ধুয়ে নেওয়ার অছিলায় 
সেখানে ফুটেছে রংবেরঙের ঘাস ফুল 
উড়ে এসেছে কত-শত রঙিন প্রজাপতি 
 
সে সময় ভেসে যাওয়ার ভয় নেই
আছে এক গ্রামীণ সরলতম অবগাহন
 
তোমার গ্রামীণ বুকে 
এরপরও যদি কেউ আসে বৃষ্টি হয়ে
ভেজো, তুমুল ভেজো সেই বৃষ্টিতে
 
তারপর চষে নাও সিক্ত মাটি
ছড়িয়ে দাও চাষিদের মতো ধান 
বপন করো বীজতলা
 
সূর্যের সৌৎকর্ষে নিড়িয়ে নাও জমি
উৎকন্ঠার রাত্রি যাপন করে কোনো এক হেমন্তের দিনে
তুলে এনো সোনালি ফসল
 
দেখবে তোমার কৃষিজ আনন্দে জোকার দিচ্ছে
আমাদের ঘরে ঘরে নবান্ন উৎসব।

মৌসুমী রায়

কাকতাড়ুয়া

তারপর কখন যে সুতোটা ছিঁড়েছে,
টের পাইনি।
ধুলোমাটি শুকনো বকুলের লুটোপুটি।
কবে, কোন মুহূর্তে কিছু ফুল তুলেছিলাম,
কিছু তার মনে পড়ে। কিছু ছিঁড়েখুঁড়ে গেছে।
তবু ট্রেন চলে যাবার পরে হুইশেল, গন্ধের রেশটুকু এখনো বাতাসে তিরতির, তিরতির।
এখনো টপটপ  রক্ত ঝরছে।
গাঁদাফুলের পাতা ডলেডলে টিপে ধরেছি ক্ষতমুখে।
বুনো গন্ধটা ফুসফুসে ধাক্কা দিয়ে ফিরে আসে
ঢেউয়ের মতো।
অগোছালো করে দেয় সাজানো বালির ঘর।
ছেঁড়া সুতোয় এফিজির মত লতপত লতপত দোল খায়।
পঙ্গপাল ক্ষেতি উজাড় করে চলে গেলে
শুধু দীর্ঘশ্বাসটুকু পড়ে থাকে।
মশানের টিমটিমে বাতি অতিলৌলিক ভয়ের
মূর্চ্ছণা গেয়ে চলে বিবাগী এস্রাজে।
গড়ের মাঠে,

নিরালম্ব কাকতাড়ুয়াটি এখনও…

 

ধ্রুব

চলমান বালিয়াড়ি

মন খারাপ হলে বিকেল বেলায় বাড়ীর কাছে 
নিথর দীঘিটার পাড়ে গিয়ে বসি
কিনারায় আসা মাছেদের সঙ্গে কথা বলি
কথা ফুরিয়ে গেলে জলে পাথর ছুঁড়ি
প্রতিটি তরঙ্গের জন্ম থেকে মৃত‍্যুর 
প্রত‍্যক্ষদর্শী একমাত্র আমিই


ছুঁড়তে ছুঁড়তে একসময় আমার আশে-পাশের
সমস্ত পাথর
ফুরিয়ে যায়


তখন 
পদ্মকুঁড়ির বুকে ভ্রমরেরা ঘুমিয়ে পড়ে
শুরু হয় বাতাসে বাতাসে 
শঙ্খধ্বনির দোলনযাত্রা
দীঘির জলে বর্ষীয়ান সন্ধ‍্যাতারার 
প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে
তাকে লক্ষ‍্য করে এক দিকভ্রান্ত নাবিক
সমুদ্রের বুকে দূর থেকে দূরে ভেসে যায়


তার কোনও আশা নেই– ক্লান্তি নেই– গন্তব‍্য নেই
দু-চোখে শুধুই চলমান বালিয়াড়ি…

অনিকেশ দাশগুপ্ত

বুনন

প্রতিটি পল্লব যেন আমার সপ্তম জন্ম,উপবীত আয়োজন
এই ঢাল বেয়ে নেমে গেছিল রাজরক্তের কথামালা 
যে ভাষায় মেঘ ঝরত এবং কুটিরের অক্ষুণ্ণ ধ্যান
তখন ছদ্মবেশে খিলানের পারে অর্ধ -সম্পৃক্ত 
হড়কে যাওয়া খ্রীষ্ট পাহাড়তলীতে
দু’পারে বকুল ঘ্রাণে ভেসে যেত আমাদের সজলতা
কতদূর, খেরোর ডানা, ভিতরে চমকে ওঠা লাল স্তবক
বহু জন্মের বাঁধ – দোমড়ানো মেঘের মায়াময় ঘুম ভেঙে
খুঁজেছে জলের পৃষ্ঠা সোনাটা হাঁসের সন্তরণ 
বাদামি টেবিলের ভেতর সৃষ্ট প্রথম পতঙ্গ-জীবনে
দূরের ঘুঙুর-ধ্বনি অথবা নতুন অন্তরীক্ষে 
যুযুধান কোনও ডাকঘরে – পালকির রেশমে বিঁধে থাকে দিন
 
 

ভাসমান

তর্পণ ও বিনির্মাণ বিষয়ক এই তুষার খেতে আবিষ্কৃত হবে
দুরূহ দুর্গ পথ, এই রৌদ্র অন্ধকারের স্তুতি, অরক্ষিত ব্লেড
অগ্নিহোত্রীর – দূর নীল পুঞ্জে গ’লে পড়ে অনন্ত ভ্রু আমাদের
অসংজ্ঞাত পাক খেয়ে ওড়ে ঘূর্ণ্যমান চিল যে পথে
যে পথে ব্রাহ্মণী, নিষ্ঠার বীজ বহন করে, সূর্য তলের সেই চক্রে স্বস্তিক আগ্রাসনের নিনাদ,
আদি মাতৃকার বিদীর্ণ জঠর থেকে চুঁইয়ে পড়ে আবাহন
ঝলমলে তরবারির প্রয়োগ আমাদের বিশ্রামশালায়
তবু অহর্নিশ মৌন ফিরে এলাম যে পিঠে রোদ্দুর বর্ণজল
শস্যসকলের স্বেদ একবার ছিটকে এসেছিল দু’চক্ষে
সার-সার নীল হিমানী, দংশিত ফ্রকের কুঞ্জে অন্ধকার ঘিরেছিল 
 
 

PAINTINGS:JACKSON POLLOCK

“পথের ফসল”

অমৃতাভ দে

পর্ব-৫

 

ইছামতী তীরে ছায়াঘেরা সেই বাড়ি
তোমার কথাই বলছে আপন মনে
তুমি হেঁটে যাও রাতের অন্ধকারে
কান পেতে পথ তোমার গল্প শোনে।

বিভূতিভূষণ, তোমার ঘরেই বসে
পথের পাঁচালী শুনব নতুন স্বরে
তুমি বলে যাবে ভানুমতীদের কথা
উঠোনের গায়ে ফুল কত ঝরে পড়ে।

কুড়িয়ে নিলাম যত ফুল ঝরেছিল
আজও তুমি সেই অরণ্য ভালোবাসো
আমরা সবাই উপড়ে ফেলেছি স্মৃতি
তবু তুমি কেন বারবার ফিরে আসো

ইছামতী তীরে ছায়াঘেরা সেই বাড়ি
তোমার কথাই বলছে আপন মনে
আমরা এসেছি শরৎ মেঘের মতো
বিভূতিভূষণ, তোমার ঘরের কোণে…

এক অন্যরকমের অনুভূতি ছিল…ষষ্ঠীর সকাল, কলাবৌ স্নান করাতে নিয়ে এসেছেন ইছামতীতে…ঢাক বাজছে…বাতাসে পুজোর গন্ধ…শরতের সেই সকালে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘স্মৃতির রেখা’য় গিয়েছিলাম আমরা… বিভূতিভূষণের গ্রামে, বনগ্রাম, বারাকপুরে (উত্তর চব্বিশ পরগণা)…ইছামতী নদী, সেতু, অরণ্য, পথ সবকিছুর সঙ্গে জড়িয়ে আছেন তিনি… মনে হচ্ছিল শরতের সকালে তাঁর সঙ্গে দেখা হবে আমাদের…

আমি গিয়েছিলাম কোনও এক ষষ্ঠীর সকালে। তালাবন্ধ অবস্থায় দেখে কোথায় সেই চাবি খুঁজতে খুঁজতে প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই একবার করে জিজ্ঞাসা করেছিলাম। সে সময় কেয়ারটেকার ছিল না। একজন নির্দিষ্ট সময় তালা খুলে দেবার কোনও লোক তখন নেই। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। এসেও দেখতে পাব না। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করলাম। রাস্তা দিয়ে আখ নিয়ে যাচ্ছিলেন একজন। আখ কিনে তা খেতে শুরু করলাম। পথ দিয়ে যাঁরা যাচ্ছেন তাঁদের জিজ্ঞাসা করছি এ বাড়ির চাবি কার কাছে থাকতে পারে। অদ্ভুত এক কৌতূহল মনের মধ্যে। বেশ খানিকটা পরে একজন বললেন এই বাড়ির দু-একটা বাড়ি পরেই যে বাড়ি রয়েছে তাঁদের কাছে চাবি থাকতে পারে। আমরা গেলাম বিশেষ অনুরোধ করলাম। ওঁরা বললেন এখন দেখানোর কেউ নেই বাড়ি খুলে। অনেক দূর থেকে এসেছি এবং আজ এই বাড়িটা দেখব বলেই এসেছি-এই বলে অনেক কাকুতি-মিনতি পরে চাবি দিলেন, আমাদের হাতেই। সে এক অদ্ভুত শিহরণ তখন সারা শরীরে। আমরা তখন কিছুক্ষণের জন্য দুই বন্ধু ওই বাড়ির অধিকারী হয়ে উঠলাম। কি বলব সেদিনের সেই মুহূর্তের কথা… যেন নিজের বড় আপন জনের বাড়িতে প্রবেশ করেছি…. ঘুরে ঘুরে দেখছি আর স্পর্শ পাচ্ছি বিভূতিভূষণের। ঘরের জানলা খুলে দেওয়া দরজা খুলে দেওয়া… আলো এসে পড়ছে ঘরের ভিতরে… লেখার জায়গা বসবার জায়গা ছুঁয়ে থাকলাম কিছু সময়। ঘরে দেওয়া ছিল আলপনা… ছিল বেশ কিছু ছবি… ভিতরের দিকে ছোট্ট একটি ঘর আমার কাছে লেগেছিল রহস্যঘন… এমন এক স্রষ্টার গৃহে কিছু সময়ের জন্য নিভৃতে কাটানোর সুযোগ হয়েছিল আমাদের। তারপর একা করে জানালাগুলো বন্ধ করে দেওয়া, দরজা বন্ধ করে চাবি লাগানো, বাড়ির চারপাশের গাছগাছালির ভিতর দিয়ে হেটে যাওয়া… যথাসময়ে চাবিটি আবার সেই বাড়িতেই বাড়িতেই ফিরিয়ে দেওয়া। তারপর ইছামতীতে কলাবউয়ের স্নান দেখা, ঢাকের আওয়াজ শোনা, নৌকো করে ভেসে যাওয়া, সাঁকো পেরিয়ে অনেকটা পথ হেঁটে যাওয়া…

পূর্ববর্তী সংখ্যা