সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ৬ কার্ত্তিক ১৪২৮
Painting: Mark Rothko
গৌতম হাজরা
পাঁজরের আগুন
রক্ত তো একই। শিরায় শিরায় বহমান!
তবুও এত ভেদাভেদ, এত কেন দুর্নাম?
সময় তো থেমে নেই, সময়ের সাথে
কি করে নির্মম হও দুর্জনের হাতে?
আলোছায়া হেঁটে যায় পথেরই বাঁকে
জুমের শহর তবু ভাতঘুমে থাকে?
মাঝে মাঝে ভাবি শুধু সীমারেখা ছুঁয়ে
পাঁজরের আগুন কারা নেভালো এক ফুঁয়ে!
উজ্জ্বল রায়
কবিতা
সকল অবশেষে ছাই। নামের আখর ধরে অঙ্গও এক সময় নিরাকার হয়। নর ও নারায়ণ একাকার। উলুখলের বাঁধন তখন আলগা। সম্মুখে তার অনন্ত প্রসারী বাহু। তুলসি যাত্রার এই অন্যপথ সীমানা ছাড়িয়েছে। আড় বাঁশির সুর থেকে উদ্ভাসিত অন্য আকাশ, সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র। কাসাই ও কুমারীর পাড়ে তখনও দাঁড়িয়ে মায়া ও পৃথিবী, ডাকে বারবার।
ফেলে আসা পথে পড়ে থাকে পিতৃ তর্পণের তিল।
সবর্ণা চট্টোপাধ্যায়
বাঁশি
ছিন্ন হতে হতে হাওয়ার সম্মুখে বসি
বেঁধেছিল যারা ঘর, নিঃস্ব কেন তবে?
শিরশিরে ব্যথা ওঠে, কেঁপে ওঠে পাঁজর থেকে থেকে
তবে কি ব্যথারাও গান লেখে চুপিচুপি?
একটা ফুঁয়ের জোরে জেগে ওঠে যে ঢেউ
গভীর বড়ো গভীর
মায়াবী আলোর মতো বিদীর্ণ করে চোখ
আঙুলে সে বিদুৎ খেলে
লুকোচুরি
ব্যথাদের বলি, ‘ভালো আছো?’
নাম দিয়েছি বাঁশি,
সুরের ভেতর এক নদী আছে, জানো?
ভাসিয়ে দেয় ধূসর আব্দার।
শুধু এক ধুলোমাখা বাড়ি, ছাদের ওপর কিশোরী রোদ লাফিয়ে বেড়ায় একমনে…
আমি তাকে ডাকনামে ডাকি
প্রতিবার সাড়া দেয় গোপনে গোপনে।
কমলিকা দত্ত
বিপ্রতীপে
সেদিন দেখেছি—
লাজুক মফস্বলের, নীলাভ ইথার পথে—
ছায়া টেনে টেনে উড়ন্ত সব সম্ভাবনার মেঘ…
মৃত্তিকাভেদী অক্ষরমালা পুষ্ট জলে ও রোদে;
উৎফুল্লিত শস্যচারায় মগ্ন অপেক্ষা, আসন্ন জলরাশির…
বিমূর্ত এক অন্তঃস্বত্তা অনিমিখ আছে চেয়ে—
হয়ত সে এক অকৃত্রিম ভ্রূণের জন্ম দেবে!
ফাঁকা হয়ে আসা জঠরে এ এক দৃঢ় প্রত্যয়ী সকাল—
সমূহ আস্ফালন,
সমূহ অন্ধকারের, বিপ্রতীপে আশাবাদী এক কৃষক দাঁড়িয়ে মাঠে…
সে কি লাঙল ফলায় শাণিত করবে আশ্চর্যের বীজ!
সেদিন শুনেছি—
আলপথ ধরে অজানিত এক সুর
শৃঙ্খলহীন মুক্তির স্বরলিপি
দ্যোতনাঘনিম জমিতে বেঁধেছে ফসল তোলার গান…
অসম্ভবের পরিখাবৃত বন্ধ্যায়তনে দাঁড়িয়ে,
ভেবেছি সেদিন…
যদি সভ্যতা এমনটা হতে পারত!
সৌমক দাস
গভীরে যাও
গঙ্গার বুকে আর ড্রেজিং হয় না
তাও কত-ই না জল ধরে রেখেছে
এমন একদিন হবে
ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে সে
টেনে নিয়ে যাবে বক্ষ মাঝে
দ্যাখাবে জমা ক্ষত-র ওপর কীভাবে বয়ে যায়
অতএব বুকের ওপর না ভেসে
ডুবুরি হও, দ্যাখো গভীরে মিশে।
কাজল
চোখের সব জল শুকিয়ে গেছে
নেমে এসে কাগজ ভেজায় না
এক কোণে কালি হয়ে জমাট বেঁধেছে।
ওই কালি দিয়ে কী লেখা যায়!
চোখেই মানায় যদি কাজল মনে করো —
ভালোবাসা চলে গেলে না হয়
কলমে ভরে নিয়ে কবিতা লিখো ।
Painting: Mark Rothko
“পথের ফসল”
অমৃতাভ দে
পর্ব-১
শহর ছেড়ে একটু চলো
গ্রামের পথে যাই
বর্ষা কেমন আলপনা দেয়
সবুজ মাঠের গায়
জলভরা সেই নদীও তোমার বন্ধু হতে চায়।
শহর ছেড়ে একটু চলো
বনের পথে যাই
বৃষ্টি কেমন রঙিন হয়ে
ছড়াচ্ছে রোশনাই
দেখবে তুমি কেমন করে সবকিছু পাল্টায়।
শহর ছেড়ে একটু চলো
মাটির কাছে যাই
হাজার মানুষ ডাকবে তোমায়
ওদের ঠিকানায়
তোমার চোখেও বদলে যাবে পথের ছবিটাই।
শহর ছেড়ে এবার চলো
গ্রামের পথে যাই
পথের দুধার তোমার-আমার
বন্ধু হতে চায়…
কোনো এক রবিবার সাইকেল ভ্রমণে আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম নদিয়া জেলার মুড়াগাছা। যাবার পথে কিছুক্ষণ চুপিপোতা বাসস্ট্যান্ডের কাছে দাঁড়িয়ে প্রকৃতিকে আলিঙ্গন। প্রকৃতি আমাদের ভালোবাসায় কাছে টেনে নিল। সবুজ গাছের সারি বিছিয়ে রেখেছিল শীতলপাটি। মাচায় বসে আড্ডা কিছু মানুষের। লাগোয়া দোকানে লুচি-সবজি। শীতকুয়াশার হালকা চাদর গায়ে প্রকৃতি আপনার সঙ্গে সুখ-দুঃখের গল্প করতে পারে।
সমগ্র নদিয়া জেলা জুড়ে কত না ইতিহাস। নদিয়া জেলার প্রাচীন জনপদগুলি ঘুরে ঘুরে দেখার ইচ্ছে বহুদিনের। কৃষ্ণনগর থেকে খুব বেশি দূরে নয় মুড়াগাছা। এখানেই আছে ৩০০ বছরের বেশি পুরোনো দেওয়ানবাটী। ছোটো দেওয়ান বাটী, বড়ো দেওয়ান বাটী, বড়োদের বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখলাম। ঠাকুরদালান, রাসমঞ্চ, শিবমন্দির, রাধামাধবের মূর্তি, অন্নপূর্ণার মূর্তি বড়ো দেওয়ান বাটীর মন্দির মুগ্ধ করলো। বহু প্রাচীন রাসমঞ্চে এখন আর দোল ,রাস উৎসব হয় না। পাশের শিব মন্দিরও বহু প্রাচীন।সমস্ত ঘুরে দেখালেন ছোটো দেওয়ানের মেজো মেয়ের তরফের বংশধর সাত্যকী বন্দ্যোপাধ্যায়।এই গ্রামের পাশেই বহিরগাছি গ্রাম। এই গ্রামের সঙ্গে লগ্ন হয়ে আছে অনেক ইতিহাস। একদিকে সাধনপাড়ার প্রতিমাশিল্প,কাঁসা-পিতল শিল্প। বহিরগাছি প্রাচীন সংস্কৃতচর্চার পীঠস্থান।মনে রাখতে হবে বহিরগাছিতেও কাঁসা-পিতলের জিনিস তৈরি হয়।
এই গ্রামেই বিদ্যাসাগরের পাদস্পর্শে ধন্য পণ্ডিত মধুসূদন তর্কপঞ্চাননের টোলবাটী এবং মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্রের গুরুবাড়ি।বহুদিনের পুরনো একটি গ্রাম বহিরগাছি। মুড়াগাছা সংলগ্ন এই গ্রামটি বঙ্গে সংস্কৃতচর্চার পীঠস্থানে পরিণত হয়েছিল একসময়। বহু সংস্কৃত পণ্ডিত এই গ্রামে বাস করেছেন। মধুসূদন তর্কপঞ্চাননের নাম এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ্য। তিনি ছিলেন পণ্ডিত রামভদ্র ন্যায়ালঙ্কারের উত্তরপুরুষ।এই রামভদ্রের কাছেই মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র দীক্ষা নিয়েছিলেন, সালটা ১৭২৯।গুরুকে বিপুল পরিমাণ জমি দান করেছিলেন রাজা কৃষ্ণচন্দ্র। রামভদ্র এই বহিরগাছি গ্রামে বসবাস শুরু করেছিলেন। বহিরগাছি গ্রামে গেলে এখনও এই ‘গুরুবাড়ি’ দেখতে পাবেন। ন্যায়শাস্ত্রে অসম্ভব পন্ডিত ছিলেন এই রামভদ্র। লিখেছেন অনেক সংস্কৃত গ্রন্থ। বহিরগাছি গ্রামে তিনি একটি টোল খুলেছিলেন। বংশপরম্পরায় এই টোল চলছিল বহুদিন। নবদ্বীপকে ঘিরে যে সংস্কৃতচর্চার ইতিহাস, তাতে বহিরগাছি গ্রামের টোলগুলির অবদান অনস্বীকার্য। মধুসূদন তর্কপঞ্চানন বিদ্যাসাগরের সমসাময়িক ছিলেন। বহিরগাছি গ্রাম নিয়ে গবেষণারত শ্রদ্ধেয় পিন্টু ভট্টাচার্য এই মধুসূদন তর্কপঞ্চাননকে নিয়ে একটি বিস্তৃত নিবন্ধ লিখেছেন। সেখানে তিনি বিদ্যাসাগরের সঙ্গে মধুসূদন তর্কপঞ্চাননের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেছেন এবং বিদ্যাসাগর মহাশয়ের এই গ্রামে এসে রাত্রিবাসের কথাও উল্লেখ করেছেন। পিন্টু ভট্টাচার্য প্রখ্যাত গবেষক শ্রদ্ধেয় হরেকৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের লেখাকে উদ্ধৃত করে বলেছেন,
“জীবনে বোধহয় শতাধিকবার বিদ্যাসাগর বহিরগাছি গ্রামে শুভাগমন করিয়াছিলেন। টাকা এক একবার আসিয়া অন্তত দুইটা দিনও বন্ধুর বাড়িতে থাকিয়া যাইতেন তিনি।” মধুসূদন তর্কপঞ্চানন ছিলেন সুপণ্ডিত এবং রচনা করেছেন সংস্কৃত কাব্যও। আমরা আমাদের সাইকেল ভ্রমণে পৌঁছে গিয়েছিলাম বিদ্যাসাগরের পাদস্পর্শে ধন্য মধুসূদন তর্কপঞ্চানন সেই টোলবাটীতে। শরীরের মধ্যে একটা শিহরণ খেলে গেল। জায়গাটি অদ্ভুত অনুভূতি এনে দেবে আপনার মনে। পিছনেই রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের সেই গুরুবাড়ি, পাশেই শিবমন্দির, গন্ধগোকুল গাছে অজস্র ফুল ফুটে রয়েছে, মাটিতে ঝরে আছে ফুলের সমাহার। সুন্দর গন্ধ শীতের সকালে সমস্ত অসুখ ভুলিয়ে দেবে। কত ইতিহাস এই বহিরগাছি গ্রামকে ঘিরে।বহিরগাছি গ্রামে রয়েছে রঘুমণি বিদ্যাভূষণ ভট্টাচার্য্যের স্মৃতিবিজড়িত টোলবাটী(বর্তমানে পূজামণ্ডপ)। আমাদের প্রিয় পিন্টু ভট্টাচার্য বহিরগাছি গ্রামের ভট্টাচার্য পরিবারের সুসন্তান।পিন্টুদা অসাধারণ সব কাজ করছেন বহিরগাছি এবং সংলগ্ন এলাকা নিয়ে। আনন্দবাজার পত্রিকায় তাঁর পন্ডিত রঘুমণি বিদ্যাভূষণ ভট্টাচার্য্যকে নিয়ে লেখাটি পড়ে খুব যেতে ইচ্ছে করেছিল ওঁদের বাড়ি। ঘুরে দেখতে ইচ্ছে করেছিল রঘুমণি বিদ্যাভূষণের স্মৃতিবিজড়িত টোলবাটী(বর্তমানে পূজামণ্ডপ)। পিন্টু ভট্টাচার্য-এর লেখা থেকে জানতে পেরেছি, “অসাধারণ মাপের পণ্ডিত ছিলেন রঘুমণি বিদ্যাভূষণ। কৃষ্ণনগর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে বহিরগাছি গ্রামে তাঁদের পারিবারিক টোল ছিল। তা ছাড়াও তিনি কলকাতার চিৎপুরে একটি টোল স্থাপন করেছিলেন। তাঁর পাণ্ডিত্যের এবং টোলের খ্যাতি বাংলার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ে। ১৮১৮ সালের ২১ নভেম্বরের ‘সমাচার দর্পণ’-এ তাঁর কাশীযাত্রার সংবাদে তাঁকে ‘অনন্যসাধারণ পাণ্ডিত্যাশ্রয় মহামহোপাধ্যায় মহারাজগুরু শ্রীযুত রঘুমণি বিদ্যাভূষণ ভট্টাচার্য্য’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।”
একটি রবিবারের সকাল এভাবেই হাতে তুলে দিলো কত না ইতিহাস, ফুলের সৌরভ, মাটির গন্ধ। সাঁকো পেরিয়ে বাড়ির পথে…। একেকটি পথ কবিতার মতো।পথের মানুষজন, তাদের যাপনচিত্র চলমান উপন্যাসের এক -একটি পাতা। আমরা উল্টে উল্টে পড়ি সেসব… ডুবে যাই জীবনের ভিতর… সোনালী মাঠের থেকে তুলে নিয়ে আসি শস্যের বীজ… রোপণ করি আমাদের ক্ষয়ে যাওয়া মনের গহীনে…