PAINTINGS:Fuyuko Matsui
নিশীথ ষড়ংগী
মুখরতা
এইসব ঘনঘোর, অশ্রুজল, লুপ্তবারিধারা
এইসব নীরবতা, দূরবর্তী, শোভনআড়াল
এইসব মুছে আসা আকাশের ক্রমঅন্ধকার
এইসব ষড়যন্ত্রে তোমার অলিন্দ বেসামাল
উথালপাতাল এই যাপনের, নামকরণের
অধিকার নেই কোনও; নেই সেই তীব্র ধূসর
অনুযোগ। শুধু মনকেমনের ভাষ্য জুড়ে জুড়ে
নিঃস্বতায় জ্বলে ওঠবার নাম শব্দমুখর
এইসব ভোরবেলা, কুটাভাস, চিররাত্রিবেলা
সারাদিন জ্বলে নেভে ঝাঁপ দেয়, দিগন্ত অপেক্ষা—
অস্বীকার মুছে মুছে দাঁড়াও নিজের মুখোমুখি
দীর্ঘ ছায়াতলে পড়ে পাণ্ডুলিপি কান্না মুছে
উঠে দাঁড়িয়েছে—
প্রীতম সেনগুপ্ত
অবিমৃশ্যকারী
শীতের পোশাক খুলে আলোচনার বিষয়, আর্তব—
বহু রাত কেটেছে সেখানে বল।
হলই বা অপবিত্র সমাবেশ, মানুষ-মানুষীর বিকার।
তবু এক কণা শিহরন।
সবুজ লনে প্রতিষ্ঠিত রঙিন ছাতার তলে
চারটি মার্জার কোলে লিখছিলে।
পঞ্চম মার্জার টেবিল সামলে মুখোমুখি, অপলক।
সামনে উড়ছে কামসূত্রের বহু নিপীড়িত পৃষ্ঠা।
শ্বেতকেশ ও শ্মশ্রুমণ্ডিত নির্জন শিল্পী চোখের কোনায় রাখে তুলি, এই বিকেলেই সমস্ত রংয়ের শেষে নামে সন্ধ্যা, শিশিরে সিক্ত অঙ্গ।
ধূমায়িত কফি এসে পৌঁছয় ক্ষীণকোটি মহেঞ্জোদড়ো সুন্দরী হয়ে। হরপ্পা নগ্নিকা বালা দুই বাহু বক্ষদেশে জড়িয়ে থাকে, থাক না!
সময় অনন্ত বয়।
সামগান শুনিনি কখনও, শুনেছি কখনও,
সেইসব স্তোত্রের ভিড়ে খুঁজি অবিমৃশ্যকারীকে!
সৌমক দাস
সে
সে কখন এল আর কখনই বা‚ গেল
ঘুম ভেঙে উঠে
চোখ রগড়াতে রগড়াতে রাস্তায় বেরোই।
আশপাশের রাস্তাগুলো সব আকাশে মিশেছে
তবে কী সে আকাশের ঠিকানায়!
আলোয় ছেয়ে যায় চারদিক ভাবতে ভাবতে।
এই আলো-ই কী তবে সংকেত
সে কি আর আসতে পারবে না
পরের বার না হয় আমি উঠে অপেক্ষা করব।
এত এত লোকের মাঝে
সে পড়ে ছিল এক কোণে
পায়ে বেড়ি পরে‚
তবু আর একটু ধৈর্য্য ধরতে পারত।
কাঞ্চন রায়
পর্বতের ওপর দাঁড় কাক
নীতিবাগীশ পর্বতগুলো মাটির মতই নরম,
দু’ফোঁটা জল পড়তেই
হাঁটু সমান কাদা ঢুকে যায় মনের ছায়াকূপে।
তারপর কালচে মেঘেরা বাহু খুলে দিলে
তারা রোদ মেখে ফিরে আসে,
কোনও এক অশুচি প্রহরে…
কার্নিশ পেরিয়ে গেলে দাঁড় কাক
গঙ্গা ছুঁয়ে ফিরে আসেন,
শাশ্বত প্রেমের গল্প বলা জ্যাঠামশাই।
পর্বতচূড়া আকাশ ছোঁয়ার আস্ফালন দিয়ে,
নদীর পায়ে মাথা ঠেকানোর খবর
গোপন করতে থাকে সারাদিন ধরে…
দীপাঞ্জন মুখোপাধ্যায়
বেঁচে থাকা
উচ্চকিত নয়
এসো চুপি চুপি বাঁচি
পাথরে চাপা ঘাসের মতন
পাথর সরে গেলে
যাকে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়
ধংসের পরের
পৃথিবীর ওপর
যাকে গড়ে নিতে হয়
নতুন দুনিয়া।
PAINTINGS:Fuyuko Matsui
“পথের ফসল”
অমৃতাভ দে
পর্ব-৭
চলো ঘুরে আসি গঙ্গাবাস (হরিহর তলা)… আনন্দবাস… ভালুকা বিল। কৃষ্ণনগর-নবদ্বীপ ঘাট সড়কপথে আমঘাটা বলে একটি জায়গা রয়েছে। সেখানে আছে একটি স্টেশন, আমঘাটা স্টেশন। তার পাশ দিয়ে একটি রাস্তা চলে গেছে গঙ্গাবাসের দিকে। এখানে রয়েছে হরিহরের মন্দির। খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।
শ্রদ্ধেয় প্রণব রায়ের লেখা ‘নদিয়া জেলার পুরাকীর্তি’ শীর্ষক প্রবন্ধে (প্রবন্ধটি আছে নদিয়ার ইতিহাস দ্বিতীয় পর্ব সংগ্রহ ও সম্পাদনা কমল চৌধুরী) লিখেছেন-
“গ্রামটির নাম গঙ্গাবাস সম্ভবত মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের সময় থেকেই হয়। কেননা কৃষ্ণচন্দ্র পরিণত বয়সে নিজের বাসের জন্য এখানে একটি প্রাসাদ নির্মাণ করেছিলেন। প্রাসাদের কোনো চিহ্ন এখন আর নেই, কেবলমাত্র ভগ্ন প্রাচীরের কিছু চিহ্ন ছাড়া। অবশ্য প্রাসাদটি খুব একটা বিস্তৃত ছিল বলে মনে হয় না। এর ঠিক পশ্চিম দিক দিয়ে তখন প্রবাহিত হতো অলকানন্দা। এই অলকানন্দা তীরে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ১৬৯৮ শকাব্দ বা ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে হরিহরের মন্দির নির্মাণ করেছিলেন। মন্দিরটির স্থাপত্যগত বৈশিষ্ট্য বলতে কিছুই নেই, আর ভাস্কর্য তো নেইই। মন্দিরটি একটি চাঁদনীর অপর দুটি চারচালা শিখর বা রত্ন। হরি ও হরের অভেদ প্রতিপাদনের জন্য কৃষ্ণচন্দ্র এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে শিলালিপি থেকে জানা যায়।…মন্দিরাভ্যন্তরে একই বিগ্রহে হরিহরের মূর্তি প্রকাশিত। এক হাতে চক্র অন্য হাতে ত্রিশূল। এছাড়া আরও অনেক শিলাময় বিগ্রহ এই মন্দিরে আছে।”বিগ্রহটিতে একই দেহে শিব-বিষ্ণু।পাশ দিয়ে বয়ে গেছে অলকানন্দা…
একটা কবিতা শোনাই—
সেই অলকা নদীর কাছে একা (অলকানন্দা নদীর কথা মনে রেখে)
গঙ্গাবাসের শীতল ছায়ায় বসে
লিখব আমি ছোট্ট মেয়ের কথা
সেই অলকা নদীই আছে পাশে
অনেক দিনের আমার কল্পলতা
রাজাও ছিল সেই নদীটির তীরে
রাজার বাড়ি গল্প রেখে গেল
সেই অলকা নদীর তীরে একা
হঠাৎ কেমন বৃষ্টি নেমে এল
নদীর জলে সূর্য ডুবে যায়
বাতাস আজো জলকে ছুঁয়ে থাকে
সেই অলকা ছোট্ট মেয়ের মতো
সেই ইতিহাস আগলে কেবল রাখে
সেই ইতিহাস পড়বে বুঝি কেউ
সেই অলকা নদীর তীরে একা
সেই ইতিহাস শুনবে বুঝি কেউ
পাতায় পাতায় নদীর কথা লেখা।
‘মন্দির-স্থপতি মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধের সৈকত মুখোপাধ্যায় লিখেছিলেন—“পরিণত বয়সে তাঁর স্থাপত্য অনুরাগের শেষ নিদর্শনটি পাওয়া যায় কৃষ্ণনগর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে গঙ্গাবাসে অলকানন্দার তীরে তৈরি বাসভবনে। পুত্র শিবচন্দ্রকে রাজ্যভার দেওয়ার পর ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে তিরোধানের সময় পর্যন্ত তিনি সেখানে বাস করেন।তবে এখানকার হরি ও হরের মন্দিরটি তিনি তাঁর কিছুদিন আগে ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে স্থাপন করেছিলেন হরিহরের অভেদ স্থাপনের জন্য। একদালাান এই মন্দিরটির সমতল ছাদে দুটি সূঁচালো মন্দিরশীর্ষ— সম্ভবত, দুই দেবতার সম্মানে দুটি শীর্ষ তৈরি হয়েছিল। তবে তাঁর লক্ষ্য যে হরি ও হরের অভেদসাধন মন্দিরের প্রতিষ্ঠাফলক থেকে স্পষ্ট।
সরল অর্থে, জগৎ-বিখ্যাত বাজপেয়ী মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র শিব ও বিষ্ণুর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকারী অজ্ঞপামরদের ভ্রান্তি দূর করতে ১৬৯৮ শকে(১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে) গঙ্গাবাসে এই মন্দির এবং হরিহরের অদ্বৈত মূর্তির সঙ্গে লক্ষ্মী ও উমাকে স্থাপন করেন। পাথরে নির্মিত হরিহরের মূর্তির বামাংশ হরির (হাতে শঙ্খ-চক্র) এবং দক্ষিণাংশ হরের (একহাতে ত্রিশূল অপর হাতে অভয় মুদ্রা)। বহু অর্থ ব্যয়ে কৃষ্ণচন্দ্র চিত্রকূট পর্বত থেকে শ্রীরামচন্দ্রের পাথরে-খোদিত পদচিহ্ন গঙ্গাবাসে এনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এছাড়া আরও দেবদেবীর (অন্নপূর্ণা, মহালক্ষ্মী, শীতলা, জগন্নাথ,গণেশ, শিবলিঙ্গ) মূর্তি তিনি এখানে স্থাপন করেছিলেন। শিবনিবাসের মতো গঙ্গাবাসেও রাজার প্রাসাদ ধ্বংস হলেও বর্তমান,নিত্য সেবাও হয় দেবদেবীর।”
এই মন্দিরের সামনে দুটি তেঁতুল গাছ পরস্পর পরস্পরকে আলিঙ্গন করে আছে। অদ্ভুত এক শীতলতা এখানে বিরাজ করছে। গঙ্গাবাস হরিহর তলা থেকে ভালুকা বটতলা যাবার পথে শুধুই ছবি। নারকেল গাছ দিয়ে ঘেরা পুকুর পাশেই সুপারি গাছ দিয়ে ঘেরা পুকুর। সবুজ মাঠের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে শরতের হাওয়া, যার মধ্যে শীতের আমেজ আছে যেন। স্বস্তিকা তো বলেই ফেলল সেই পরিচিত কবিতার লাইন ‘এমন ধানের উপর ঢেউ খেলে যায় বাতাস কাহার দেশে’। কথা বলল একটু প্রাণ ভরে শ্বাস নেওয়া যেতে পারে। যদিও গ্রামের সুন্দর রাস্তা জুড়ে পার্থেনিয়াম ভরে আছে। তাই ওর মায়ের সতর্কবাণী… এতেও কিন্তু বিষ। তবু এই পথ আজকে আমাদের দিল এক অনাবিল আনন্দ। গঙ্গাবাস থেকে ভালুকা বটতলা যাওয়ার রাস্তাটি সত্যিই চোখে লেগে থাকবে বহুদিন। ভালুকা বটতলা পেরিয়ে আমরা পৌঁছালাম মুকুন্দপুর। মুকুন্দপুর এর বাঁদিকে চলে গেছে আনন্দবাসের রাস্তা। একটু এগোতেই চোখে পড়লো অনেকগুলি জলাশয়। জলাশয়ে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে সবুজ গাছের সারি। গ্রামের সমস্ত পুকুর এক একটি কবিতার মতো। পুকুর পাড়ে বসে ছাগল ছড়াচ্ছেন একজন বৃদ্ধা একজন বৃদ্ধ। তাদের সাথে গল্প হল কিছুক্ষণ। মাছ ধরছেন অনেকে। তারপর আমরা রওনা দিলাম আনন্দবাসের দিকে। সঞ্জয় রাহার কথা অনুযায়ী আনন্দবাসে গেলেই মন আনন্দে ভরে ওঠে। যদিও কিছু আগেই কথা বলে নিয়েছি সঞ্জয় রাহার সাথে। আমি শিমুলগাছি, পানশিলা পেরিয়ে চলে গিয়েছিলাম ভালুকার দিকে। পিছনে ফেলে রেখে গেছিলাম আনন্দবাসকে। তাই আজ আবার চলে গেলাম ভালুকা বিলে।আমার অন্যতম প্রিয় জায়গা হিসেবে কদিন আগেই সেটিকে আবিষ্কার করে ফেলেছি। ভালুকা বিলে সন্ধ্যা নামা দেখেছি। আজ বিকেলে আরেক রূপ দেখে এলাম। বিলকে ঘিরে ঘুরে এলাম অনেকটা পথ। মাছ ধরায় ব্যস্ত বহু জন ছিপ হাতে। ডিঙা ভাসছে মাছের খোঁজে। ছোট্ট একটি ছেলে সঙ্গে তাঁর দুই সাথীকে নিয়ে নৌকা চড়ছে। সেখান থেকে আমরা আবার মুকুন্দপুরের দিকে রওনা হলাম। পানশিলা শিমুলগাছি পেরিয়ে বাঁদিকে রাস্তা ধরলাম আনন্দবাসের। সত্যিই মনোমুগ্ধকর একটি গ্রাম। তারপর ফেরার পালা। মুকুন্দপুর যাবার রাস্তায় উঠে পৌঁছে গেলাম নবদ্বীপ-কৃষ্ণনগর মূল সড়কে।