সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম ৭২ তম সংখ্যা
সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৮
Paintings : Pierre Soulages
ফাল্গুনী ভট্টাচার্য
ব্যাক টু প্যাভিলিয়ন
আমি এতদিন চিন্তা করে এই জেনেছি যে,
খেলতে খেলতে কবিতা লেখা যায় না।
কিন্তু
কবিতা লিখতে লিখতে খেলা যায়।
সিদ্ধান্তে আসার পর আমার ব্যর্থ ছায়া
ভেঙে চুরে পড়েছে আয়নায়…
ব্যাপারটি বেশ সহজ মনে হলেও
ওর মধ্যে আছে নিপুণ ফিলোজফি,
আছে অ্যারিথমেটিক সরল আর
তার-ই ডালে ডালে এস্থেটিক্স ফলে।
আমি এক বোকা ক্রীড়ামোদী লোক
লঘু আনন্দের খেলায় মেতেছি,
লিখতে চেয়েছি বারংবার
একটি অমোঘ শ্লোক।
খেলায় মন বেশি দিলাম বলে
আড়াল-প্রত্যাশী পাখিটি গেল চলে…
লেখাকে খেলার স্বর্গে কেউ কেউ নিয়ে যান
যেমন শ্রীহোমার ব্যাস বাল্মীকি জ্ঞানী
লেখা তো তখন আর লেখা থাকে না
হয়ে ওঠে ব্রহ্মাস্বাদ-রূপী দিব্যবাণী!
কবিতা লিখতে লিখতে এঁদের মোহন খেলা
বিশ গজের কোর্ট ছাড়িয়ে
দেশ ছাড়িয়ে
বিশ্ব ছাড়িয়ে অনন্ত ভবিষ্যের পথে
চলে যেতে থাকে…
প্লিজ, দয়া করে আর খেলতে বলবেন না আমাকে…
গৌতম রায়
পূর্ণিমা উপত্যকা
এক একটা পূর্ণিমা আসে
দেওয়াল দেখি
দেওয়াল তো আমাদের আয়না,
পূর্ণিমার কোনও দেওয়াল থাকে না
যা থাকে তা আমাদের ভেতরের বিভেদ।
কত পাহাড় গলে গলে চাঁদ হয়ে যায়—
আমাদের ভেতরের পাহাড়কে গলনাঙ্কে গলিয়ে
জ্যোৎস্না নদী করে দিলে
মানুষ একটা পূর্ণিমা উপত্যকা হয়।
পূর্ণিমা আগুন দাও
আগুনের রোদে পুড়ি।
মণিদীপা বিশ্বাস কীর্তনিয়া
বেহুলা মঙ্গল
লোহার কপাট খুলে
এইবার আঁধারমান্দাস যাবে
জোয়ারের ভরা কোটালে
হাওয়ার বেদীতে ফণা রাত্রি নাচায়
পৃথিবীর মেয়ে এসে সামনে দাঁড়ায়
খুনের প্রমাণ নাই!নাচুনী নিলাজ
মর্ত্যের জিভ তোর খসে যাবে আজ
অভিশাপে হাসে মেয়ে, মেয়ে কুহকিনী
সোনার জাঁতিতে কাটে সর্পকাহিনী
গানভর্তি ঘূর্ণিমুদ্রা.. ঘুঙুরের ঘাম
পুষ্পবৃষ্টিতে স্বর্গ ঢাকে ধর্ষকাম
নাচ শুধু চোখ রাখে সুরের আদলে
পদ্মর ডাঁটি বেয়ে কালফণা দোলে
আয়ু কাড়ো কার দেবী আদর না পেলে?
আহত জন্মকথা নেমেছে পাতালে
আমাদের নারীজন্ম অনাদরে গড়া
প্রতি ঘাটে ভাসি দ্যাখো কোলে বাসী মড়া
তুমি আমি দুজনেই পুড়ি জৌঘরে
মায়া খুঁজি হন্যে হয়ে ছাইয়ের ভেতরে
অবজ্ঞায় ফুটে উঠি মাটির ময়ূর
নাচি আর ঘুরে যায় সাপুড়ের সুর
কহবতী ঘুঙুরকে ডেকে বলি শোনো
নিজস্ব গান আমরা খুঁজিনি কখনো
পুরুষের পুজো-প্রেম কী হবে তা দিয়ে
অভিমানে হাত রাখে পৃথিবীর মেয়ে
ছুঁড়ে দেওয়া ফুল দেবী আজ দূরগামী
শুধু প্রণামের মতো যদি ভালবাসি আমি?
মঙ্গলঘট ঘিরে দেবী ও মানুষী অপলক
মেয়েদের ব্রত জুড়ে নামে মায়ালোক
ভুবনের ছায়া মেশে কান্নারেখায়
চোখের গাঙুড় আর জলে ভাসা নীলপদ্ম এক হয়ে যায়..
গৌরব সরকার
চালচিত্র
লোডশেডিংয়ে কুমোর বসে বানায় চালচিত্র।
সংবাদ পত্রে দেখি, তার ফুটো চালের চিত্র।
বৃষ্টি আসে, শহর ভাসে, গাঁয়ের বুকের ওপর–
দশটা নদী ছোটে। ডুবে থাকে দশদিন দশ অবতার!
রঙের গন্ধে ঘুম ছুটে যায় কুমোর পাড়ায়
সঙ্গে দোসর বর্ষা যদি বিপদসীমা ছাড়ায়।
চালচিত্র কেমন ধারা হবে বলতে পারো?
পুরাণের গাথা, দেবাসুরের যুদ্ধ আঁকবে?
কৈলাসে শিব-দুগ্গা সংসার করে কেমন করে,
নাকি ফুটো চালের তলায় বসে কুমোরের বউ
আলু ফুলকপির তরকারি,
দু-টাকার ভাতের নিত্য আয়োজন–আঁকবে?
কুমোরের বড় ইচ্ছে তার যা যা নেই
সে বেশ মনের মতো গুছিয়ে আঁকে।
তাতেও উভয়সংকট যেন ওৎ পেতে বসে থাকে!
শিল্পী স্বত্ত্বার নিগূঢ় লক্ষ্মণরেখা উড়তে থাকে,
সাইক্লোনে উড়তে থাকা ছাদ-চাপানের মতো।
চালচিত্র বুকের মধ্যে ঝড় তোলে,
তাতে জলের ফোঁটা পড়ে দাগ ধরে যায় রঙে–
ভিটামিন বি টুয়েলভ্।
সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও
টনক নড়ে না দেব ও ভূতের,
চালচিত্র বলে দিতে পারে–
কুমোর কেন কাঁদে? তার ঘরে কেন জল পড়ে?
সিদ্ধার্থ ঘোষ
সম্পত্তি ভাগ
মায়ের হাতের খুন্তি কী নিখুঁত –
একটা ডিম্ সমান দু’ভাগ;
হাঁ করে থাকে দু’ভাইয়ের পাত!
হওয়ারও তো বয়স বাড়ে
সময় বুঝে সবাই যেমন যায় অতলে –
তেমন বাবা গেল, মাও গেল পিছন পিছন
দু’ ভাইয়ের জন্যে পড়ে অবিভক্ত পিছুটান!
তরলের মতো যা কিছু উচ্ছিষ্ট ব্যাঙ্কে
সমান ভাগ নামতার তালে তালে
যা কিছু মাটির মতো কঠিন, তাও ভাগাভাগি
দশমিক কায়দায় –
শেষমেশ ভাগের খেলায় পৌনপুনিক এল
উন্মাদিনী বোন ভাগশেষ, ঝুলল
মাথায় ভাগচিহ্ন নিয়ে, দু’ভাই সামনাসামনি
চার চোখে চকচক করছে – মায়ের ধারালো খুন্তি!
Paintings : Pierre Soulages
“পথের ফসল”
অমৃতাভ দে
পর্ব-৮
কুমারী নদীর ধারে ডুংরির উপর ঘর বেঁধেছ তোমরা
তোমাদের ছায়া নদীর স্বচ্ছ জলে এঁকেছে
মায়াময় মূর্তি
ভাসমান ডিঙা বয়ে নিয়ে যাচ্ছে
মনসামঙ্গলের কাহিনি
চারিদিকে ছড়ানো-ছিটানো
বাসন-কোসন, ছেঁড়া কাঁথা…
কুলুঙ্গিতে মনসার ছবি যত্ন করে রাখা
নথ-পরা কালো বউটি চাঁদনী রাতে
জমকালো শাড়ি পরে যাবে উৎসবে
মহুয়ার নেশায় মাতাল বর গল্প
শোনাবে জঙ্গলমহলের
ঝুমুর গানের সুরে, ছৌ নাচের ছন্দে,
টুসুর তালে জন্ম নেবে কত কবিতার অক্ষর
আমি সারারাত ধরে সাদা পাতায় অন্য
এক ভারতবর্ষকে লিখে যাব…
ভোরের ট্রেন পূর্ণিমার চাঁদকে সাক্ষী করে লালমাটি ছুঁয়েছে। খড়িদুয়ারা পুরুলিয়া শহর থেকে সত্তর কিলোমিটার দূরে। এই গ্রামের সৌন্দর্য চোখে লেগে থাকবেই দীর্ঘদিন। ঢেউ-খেলানো রাস্তার ধারে পাহাড়ি-টিলা যার স্থানীয় নাম ডুংরি তারই উপরে সৃজন উৎসবের আয়োজন। চারিদিকে জঙ্গল। দূরে বয়ে চলেছে কুমারী নদী। মুকুটমণিপুরের বিপরীত দিক এটি। মানবাজার আর বান্দোয়ানের মাঝে অবস্থিত খড়িদুয়ারা-কুমারী গ্রাম। এখানে থাকার বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নেই। মানবাজার কিংবা পুরুলিয়ার হোটেলে থাকতে হবে। সৃজন উৎসবের সময় গাড়ি করে এসে সারারাত উৎসবে মেতে থাকার মজাই আলাদা। উৎসবে এসে চারপাশের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখতে ভুলিনি। আমরা বেরিয়ে ছিলাম—-জঙ্গলের পথ পেরিয়ে নদীর ধারে। কুমারী নদীর উপরে গড়ে উঠেছে কুমারী-ড্যাম। জানা গেল ড্যামে জল থাকার সময়গুলোতে তারা ওই জমিতে চাষ করে। অন্যসময় মাছ ধরে।নদীর ধারে যে দুই-ঘর মানুষ থাকে তাদের আন্তরিকতা চোখে পড়ার মতো। বাড়ির বৌটিই তার স্বামীকে বললেন তিনি যেন আমাকে টিলার উপর নিয়ে যান আর সেখান থেকে একদিকে বিকেলের সূর্যাস্ত ও অন্যদিকে নদীর নীল জলরাশিতে গাছেদের প্রতিবিম্ব দেখান। চোখ জুড়িয়ে গেল । পাহাড় নদীর কোলে মাথা রেখেছে। উঁচু টিলার উপরে দাঁড়িয়ে শান্ত নদীর কাছ থেকে নিলাম নীরবতার পাঠ। কোলাহল থেকে দূরে নিরিবিলি শান্ত সবুজের মধ্যে জীবনের অন্য অর্থ খুঁজে পেলাম যেন। মাঝিদের মনসার পুজো হয় নিত্যদিন তাঁদের ঘরে। সন্ধেবেলায় তাঁরা মেলায় যাবে। মাতবে মাদলের তালে। কোনোরকম সরকারি উদ্যোগ ছাড়াই কয়েকজন সহৃদয় মানুষের চেষ্টায় বহু বছর ধরে এই উৎসব হচ্ছে সেখানে। এই উৎসব ওদের কাছে ‘শিল্পের মেলামেশি জীবনের মহাসংগম। ‘উৎসব নিয়ে রচিত গানে শোনা যায় হৃদয়ের কথা-” ই মেলা কেমন মেলা ভাইরে কেমনে বলি/ডুংরি-জঙ্গলে ঘেরা প্রেমনদী মনোহরা”। পুরুলিয়া শহর থেকে এত দূরে নির্জন অপরূপ পরিবেশে সারারাত ধরে চলে ঝুমুর,ভাদু,টুসু,জাওয়া,বাউল গান,কীর্তন গান,মনসার পালা,রামকথা ,রকমারি আদিবাসী নৃত্য,করম নাচ,ঘোড়া নাচ,নাচনী নাচ,রণপা নৃত্য,আদি শবর নৃত্য,ছৌ নৃত্য। ভিন্ন রাজ্যের সংস্কৃতিও আপ্লুত করে। নানান লোকবাদ্য সহযোগে লেপচাদের লোকনৃত্য,মিজোরামের লোকশিল্পীদের সুরমূর্ছনা চাঁদনি রাতকে প্রাণময় করে তুলেছিল। “সর্ব অর্থে ব্যতিক্রমী এই মেলা। এখানে রাজনীতি নেই। নেতা নেই। ভাষণ নেই। উদ্বোধন নেই। দর্শকাসনে নারীপুরুষের মাঝে দড়ি বিভাজন নেই। এখানে চাঁদ আছে। প্রেম আছে। টিলা আছে। আছে নানান আঞ্চলিক ও প্রাদেশিক বাজনা-ঢাক-ঢোল-নাগরা-ফুলেট-ধামসা-মাদল।” সত্যিই হলদে টিলা,নীল জঙ্গল,সোনালি নদী আর জোছনা নিয়ে তিন রাত ধরে চলা নাচ-গানের এই মহা উল্লাস আমাদের নাগরিক ক্লান্তির উপরে ছড়িয়ে দেয় মহুয়ার ফুল। পুরুলিয়ার এই অঞ্চলের মানুষের অভাব, দারিদ্র্য,দুঃখ আছে। সব ভুলে ওরা মেতে ওঠে আনন্দ-পরবে,আঁকড়ে ধরে তাদের নিজস্ব সংস্কৃতিকে। তাদের মুখের হাসি,বাঁধভাঙা আবেগ জঙ্গলমহলের আতঙ্ক মুছে দেয়।মহুয়ার নেশায় মাতাল এই মানুষগুলো বাঁচিয়ে রেখেছে তাদের সংস্কৃতি। খাবারের দোকানের পাশাপাশি বসেছে নানান হস্তশিল্পের দোকান।যত রাত বাড়ে মানুষের ঢল নামে উৎসব প্রাঙ্গণে। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদমামা। দলে দলে শিল্পীরা আসছেন। কয়েকটা টেন্ট করা হয়েছে। শিল্পী-অতিথি-অভ্যাগতদের জন্য একটিই খাবারের জায়গা। ভালোবাসার আবেশ-জড়ানো খাবারের তৃপ্তিও আলাদা। একদিকে ধামসা-মাদলের তালে নৃত্য অন্যদিকে ঝুমুর গানের সুরে মাতোয়ারা একদল মানুষ। আমাদেরও ইচ্ছে করে গাইতে-“মাথা বাঁধব বল-খঁপায়/শাড়ির আঁচল ফুল-তুলা/চল মালতি,সৃজনমেলা যাব/ইলিক-ঝিলিক-সিলিক শাড়ি পরবে চমকাব।” আর একটি বিষয় সবার সাথে শেয়ার না করে পারলাম না । ড্যাম দেখে ফেরার পথের পাশে মানুষের জটলা কিসের জানতে গিয়ে শুনলাম মোরগ লড়াই চলছে। মোরগ-লড়াইকে ঘিরে কয়েকশো মানুষের উন্মাদনা অবাক করেছে। আহত মোরগের জন্য ডাক্তারবাবুও উপস্থিত। মোরগগুলিকে ট্রেনিং দেওয়া হয় আগেই। আহত মোরগ পরাজিত হিসাবে গণ্য। শহরের ব্যস্ততা গ্রাস করেনি এখানকার লোকেদের।হাজার হাজার মানুষ সন্ধে থেকে ভিড় জমলো সৃজনভূমিতে। ওদের ভিড়ে আমি কখন হারিয়ে ফেললাম নিজেকে।মনে গেঁথে নিলাম—‘ঝিরি ঝিরি বহে লদী/সিরি সিরি হাওয়া/চল মিনার মা সৃজন মেলা যাব।’