সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ৩ পৌষ ১৪২৮

Paintings : Pierre Soulages

নির্মল হালদার

স্বপ্ন

স্বপ্ন তো একরকম বাঘ
হাঁ করবেই।
আমিও বাঘের মুখে ছটফট করি।

স্বপ্নেরা শুধুই বাঘ হলে
রামধনু আঁকব না আর।
আমার ললাট থেকেও মুছে ফেলব
স্বপ্নের আঁকি-বুকি

স্বপ্নের ঘাম।

দেবাশিস সাহা

দলছুট

দলছুট ট্রেন। ট্র‍্যাক থেকে বেরিয়ে পড়িমরি ছুট। দেশের বাড়ির দিকে। সেখানে অতীত মায়ার গলা ধরে কাঁদে। মায়ের খুব চেনা এই গন্ধ। শীত আড়াল করতে গোটা সূর্যটাকে নামিয়ে এনেছিল মা। সেই থেকে আমি শীততাপনিয়ন্ত্রক। যন্ত্র আমাকে আরাম দেয়। একেই না কি লোকে সুখ বলে। তবে সেই হাতপাখা, রূপকথার গল্প, খোলা ছাদে জ্যোৎস্না স্নান কি মিথ্যে সুখ?
সু তুমি বলো, আমরাও তো এক-একজন অপু দুর্গা। সুখ দেখার নেশায় ছুটে বেড়ায় এই শরীর থেকে আরেক গুহায়।
খুব ছোট্ট আয়ু। পরিমাণে ও অনেক কম। বাবুই পাখির বাসা বুননের রসায়ন জানা হল না। জানা হল না সাপের শঙ্খলাগা বা মিথুন প্রক্রিয়ার ঋতু বা মাস।
দলছুট জীবন। বাসা খোঁজে। খুঁজতে খুঁজতে চলে যায় কুয়োতলা। সেখানে মুখ বাড়িয়ে জানতে চাই
ছায়া মাসির আত্মহত্যার রহস্য। হাতে টানা রিক্সা এগোতে থাকে যৌবনের দিকে।

সুবীর সরকার

খামার

ভরসা বলতে গুগল ম্যাপ। সাদা রঙের সকাল।

‘শয়নকক্ষে উঁকি দিলে খুব বেশি পেতে পারো

                                     হলদে মাফলার’

মধ্যযুগের কামান।

সিটি বাজাতে থাকা উন্মাদ।

অথচ ক্ষমার কোনও প্রতিশব্দ হয়

                                না

ঘোড়ার গলায় ঘণ্টা বাজলে

ঝুঁকি নিয়ে প্রবেশ করতে হয় খামারবাড়ির

                                        উঠোনে

তপন মণ্ডল অলফণি

মুখোমুখি

মুখোমুখি হলে মনে পড়ে আমাকে
মুখোমুখি হলে মনে পড়ে বাড়ির পাশের পুকুরটাকে
চাষের ক্ষেত, বর্ষাকালের আবাদ


মুখোমুখি হলে মনে পড়ে স্টেশনে ফিরিয়ে দেওয়া শিশুটির কথা
মনে পড়ে তার পিতৃহীন জন্মের কথা
মনে পড়ে আমার সাদা জামার উপর কালো ট্রাইএর কথা

মুখোমুখি হলে মনে পড়ে সেই মেয়েটির মেয়েটিকে
যে আমায় বলেছিল আপনার মতো খারাপ মানুষ পৃথিবীতে দুটো নেই
তার নির্ভেজাল সত্য কথা
মনে পড়ে তার চাহিদা পূরণ না করতে পারা ব্যর্থতার কথা

মুখোমুখি হলে মনে পড়ে বাবার মৃত্যুর কথা
তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কথা
মনে পড়ে বাবার চিন্তার বিরুদ্ধে নব্বই ভাগ মানুষের বাঁকা হাসির কথা
মনে পড়ে বাবার চিতায় সত্যকে জ্বলতে দেখার কথা

মুখোমুখি হলে মনে পড়ে আমাকে
আমিও কীভাবে মিশে যাচ্ছি জনস্রোতে
মুখোমুখি হলে মনে পড়ে বাবার মুখ
শিশুটির মুখ, আর আমার সাদা জামার উপর কালো ট্রাই

 

নীলাদ্রি দেব

ক্যাটসআই, ম্যাস্টিকরোড: তিন

মৃত খই উড়ছে, দেখো
ধূপের ধোঁয়ার ভেতর অহং-এর স্তূপ
যে দেহ গলে যায়, ঘি ও আতরগন্ধ
এর বিপ্রতীপে নদী, পেরিয়ে…
        আরও বৃহৎ জীবন ছড়িয়ে যাচ্ছে

Paintings : Pierre Soulages

“পথের ফসল”

অমৃতাভ দে

পর্ব-৯

নদী লেখে প্রাচীন বটের গল্প
সাঁকোর উপর দিয়ে হেঁটে যায় সকালবেলা
জল কথা বলে জীবন যেরকম…
পথের ফসলে শীতের শব্দেরা টুপটুপ ঝরে পড়ে
কবি চোখ রাখে শাখায়-শিকড়ে
কোটরে কোটরে জমে থাকে অন্ধকার
ঈশ্বর স্থির হয়ে শুষে নেয় সব অপরাধ
পাখির পালকে কুসুমবিকেল
সিঁদুর-হলুদ-লেপা পাথরপ্রতিমায় মাথা পেতে বর্ণমালা চেয়ে নিই…

পথের ফসলে সন্ধ্যা নামে
বনবিবি হাত ধরে নিয়ে যায় প্রত্নজীবনে…

বেরিয়ে পড়ি বহু প্রাচীন বটগাছের গল্প শুনতে। বনবিবিতলা, নদিয়া জেলার অন্তর্গত গাটরা গ্রামে। জায়গাটি বাগবেড়িয়া গ্রামপঞ্চায়েতের মধ্যে পড়ে। বহু প্রাচীন এই বটগাছ যেন এক ইতিহাস… বহু অভিজ্ঞতা যেন তাঁর… কান পাতলে শোনা যায় বহু পাখির কলস্বর… নুয়ে-পড়া ঝুড়ি অভ্যর্থনা জানাবে আপনাকে… মা কালীর মূর্তি যেন সমস্ত অসুখকে ভুলিয়ে দিয়ে বলবে শুভের কথা… পাশ দিয়ে বয়ে চলা পলদা নদী যেন ওর সখি… সবুজের ক্ষেত ওর বেড়ে ওঠার সাক্ষী… কত রহস্য লুকিয়ে রয়েছে চারপাশে… রোমাঞ্চিত হবেন… কখনো কখনো শিউরেও উঠতে পারেন… একাকী নির্জনে গা ছমছম করতে পারে… সূর্যের আলো ফ্ল্যাশ লাইটের মতো এসে পৌঁছায় ঝরে-পড়া পাতার ভিতরে… জীবনানন্দের কবিতার মতো বটফলের ঘ্রাণ অনুভব করতে পারেন… ঝরাপাতার মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে মনে এসে যেতে পারে কবিতার লাইন… একটি বটগাছ একাকী এই নির্জনে নিজের মতো করে বেড়ে উঠতে চাইছে ৫০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে… বাধাও পাচ্ছে স্থানীয় মানুষের… অন্যদেশ হলে জানি না কি হতো? প্রকৃতির বিস্ময় নষ্ট হতে দিতে পারি না আমরা…. ধ্বংস চাইতে পারি না এর… শুধু কান পেতে তার গল্প শুনে আসতে পারি… তার শাখা-প্রশাখায় থাকা পাখিদের কলতানে দুঃখ ভুলতে পারি…. পাশ দিয়ে বয়ে চলা নদীর সাথে দু’দণ্ড শান্তির বাক্যালাপ হতে পারে… কীভাবে পৌঁছবেন সেখানে? যে পথ দিয়ে যাব এখানে তার কথা বলি। পলদা-মুড়াগাছা থেকে পলদা নদীর উপরের বাঁশের সাঁকো পেরোলেই পৌঁছানো যায় ময়দানপুর। বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে আমরা যখন ওপারে গেলাম তখন ওপার থেকে উল্টোদিকের ছবিটা যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস… নদীর উপর তৈরি বাঁশের সাঁকোতে মোটরসাইকেল হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে হয়… ওপারে গিয়ে ছায়াসুনিবিড় গাছের তলায় বসে-থাকা মানুষটিকে দশটি টাকা দিতে হলো পারাপারের জন্য… জানা গেল গ্রামের মানুষেরাই রক্ষণাবেক্ষণ করে এ সাঁকোর… দুটি চায়ের দোকান আপনাকে অভ্যর্থনা জানাবে… ময়দানপুরের দিকের ঘাটটি সত্যিই আমার চোখে বড়ো প্রাণময় হয়ে উঠলো… আর পথের সৌন্দর্যের তো কোনো কথাই নেই…

পূর্ববর্তী সংখ্যা