সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৬ পৌষ ১৪২৮

কবিতা আশ্রম প্রকাশনার বই। বাড়িতে বসে সংগ্রহ করতে চাইলে কভারে ক্লিক করুন।

নির্মল হালদার

একতারার একটি তারে

মন ভোজন

 

আমি বনভোজনে নেই মন ভোজনে আছি।

নুন হলুদ তেল লাগে না, শুধু মন
একাকী নির্জনে মন ভোজন করি

মুহূর্তের পর মুহূর্ত

আমি সাজাই এক পাত মন, আমি সাজাই
আমার আনন্দ-বেদনা,

চোখের জলের হাসি।

 

চুম্বন

 

ভালবাসলেই ভোর আসে

পাখিদের কিচিরমিচর

গাছপালার ডাক

ভালবাসলেই শিশির জলে তোর মুখ
আমার পায়ে তোর চুম্বন।

 

নাসির উদ্দিন আহমদ

কেউ কবি কেউ কবিতা

তুমিও রাত্রি নাচাও
শরৎ হেমন্ত এক হাতে করে ডেকে নাও
তুমুল বসন্তে
গেয়ে ওঠে কুয়াশা আঁচল
পৃথিবীর সমস্ত ঝড় বেসামাল হয়ে আছড়ে পড়ে
শিরায় কূলে কূলে
ভুলে যাই আচার কূল কাল
শুধু আড়াল হাসে
গ্রীষ্ম উড়াল দিলে নেমে আসে
ঘোর বর্ষণ!

২
তখন মগ্নতা
তখন রোদ বৃষ্টি ভুলে বেসামাল উৎসব

কাঁপিয়ে বাঁশঝাড়
ঝাউবন
মত্ত স্বর ব্যঞ্জন ধ্বনি একই কবিতায়
তাপিত জীবন শেষে চরায় আটকে যাওয়া নদী
নূতন নাব্যতায় গেয়ে যায় স্রোতের গান
তখন কোমল কোলাহল বেজে ওঠে
বিভুল সুরে
একাকার সমস্ত ভূগোল!

তখন কেউ কবি কেউ কবিতা
কিংবা দুজনেই পাঠ ভুলে বেজে ওঠা মুগ্ধ বসন্ত!

৩
এ কেমন হাল কেমন নিয়তি
কে কারে আটকে রাখে বিশুদ্ধ তারে
এ শুধু মোহ কিংবা মুগ্ধতা নয়
ডুবে থাকা প্রসূণ
রঙে কিংবা অক্ষরে
বিকাশমান দ্রাক্ষা বন অন্তহীন দারুচিনি দ্বীপ
বার বার ফিরে আসে
কথা কয়
রঙে রঙে বিভুল প্রজাপতি
উড়ে যায় মধুর কণিকায়!

৪
এখানে ঘাসফুল শুয়ে আছে
মগ্নতায় ডুবে গেছে লগ্ন
পড়শীর দীঘি
এখানে ঝমঝম কবিতার অক্ষর
ফুটে আছে উপমার ঘর
এখানে মিশে গেছে কালি আর কলমের
খেয়াঘাট
এখানে বিভ্রান্তি সরায়ে ক্রমশ
জেগে উঠছে নূতন আরশ
হরফে হরফে বসন্ত
প্রেমের নান্দিপাঠ

৫
কবি আজ কবির আঁচলে
গার্হস্থ ভুলে জুড়ে দেয় সোনালী আখর
শূন্যতা উড়ে যায়
কথা হাসে
বেমালুম ছুঁয়ে যায় কত রং
কত প্রাঞ্জল বিকেল
নোনা ধরা অলিন্দে এক অদ্ভুত
আঁচড়ে ঝলমল করে জেগে ওঠে
বিদিশার রাত
স্বপ্ন সাহসে আজ কম্পমান কবির
দুটো রিক্ত হাত!

৬
তুমিও এলে
এই দিঘিজলে ঢেউ তুলে সুখ এল
তাপিত দাহন শেষে
বৃষ্টির উৎসব
পদ্মের রঙে মিশে গেল পুরনো অন্ধকার
পাতায় পাতায় নূতন চুম্বন
রীতি ভুলে কোথাও নেমে এল
সুখ সর্বনাশ!

৭
পথ নেই
না কি আছে?

কে জানে

নিরুত্তর কবি ও কাল
পথিক হাঁটছে নূতন রাস্তায়
কবিতার সন্ধানে
চেয়ে দ্যাখে মহাকাল!

কাজী নিজামউদ্দীন

ভাঙনের তীরে ঈদ

এতদিন অতীতের গহ্বরে লুকোনো চাঁদ আর চুরি যাওয়া স্বপ্নকে লাটাই দিয়ে গুটিয়ে আনছিলাম।
ঘরের ভিতরে বসে মনের ভিতরে আর এক ঘর
খুঁজছিলাম সেখানে ঈদের চাঁদ উঠলে মখমলের
সব পোষাক পরে আমি সেজে উঠতাম সেহেরিয়ারের সহস্র এক আরব্য রজনীর এক শাহেনশা।
আমার গলায় হীরে জহরতের মালা সাদা আরবি ঘোড়া ছুটিয়ে তালগাছের মাথার ওপর দিয়ে খুব জোরে আমি সেই চাঁদকে ছুঁয়ে এসেছি।
ঈদের সেই সকালে রান্নাঘরে মা চাচী দাদীর ব্যস্ততা;
আসত গোলাপজল মিঠা আতর আর জাফরান
এর সুগন্ধি ভরা একটি সকাল দুধ নারকেল কাজু আর কিসমিস ভরা রোজা ভাঙার বাটিভর্তি সওগাত।
সকালে স্নান নতুন পায়জামার দড়ি না পরাতে পেরে মায়ের পিছু পিছু ঘোরাঘুরি দাদা বৌদিদের হাসি-তামাসা।
ঈদগাহে নামাজে সবার সাথে দাঁড়িয়ে মোনাজাত আর প্রার্থনার শেষে আলিঙ্গন
হাফেজ জীর সঙ্গে হাত মিলিয়ে তার দোয়া পড়ে মাথায় ফুঁ দিয়ে আশীর্বাদ।
তারপর সারাদিন এবাড়ি ওবাড়ি সালাম আর একটু খা একটু খা আর পারছি না আচ্ছা তবে এই দই বড়াটা খা বলে বড় মা মুখে একচামচ গুঁজে দিলেন।
এইসব স্নেহের পরশ আজ এই ভাঙনের তীরে দাঁড়িয়ে দেখি।
কত গৃহহারা সর্বহারা দের ঈদ কেড়ে নিয়েছে অতিমারি আর ভয়ানক ঝড় এর তাণ্ডব।
এখন এই ঈদের চাঁদের ওপারে নৌকায় ভেসে যাচ্ছি
আর সেই সব দিনের প্রতীক্ষায় আছি যেদিন ছোট মেয়েরা আবার রাত জেগে
লাগাবে মেহেদী দুই হাতভরে; আর সকালে রান্না ঘরে চুরি করে খাবে দস্যিদামাল
নারকোলের টুকরো কাজু কিসমিস আর ওদের মা কপট রাগ দেখিয়ে তেড়ে আসবে।
ওরা হাসতে হাসতে ছুটতে থাকবে আর সবাই ওরা মনে মনে শাহেনশা শাহ আলম হয়ে উঠবে।
ঈদের এই মায়াবী ক্ষণিক চাঁদটি যেন ওদের সব সুখের নৌকা এনে দেয়।

রুমা তপাদার

শূন্য

আমাদের সমতলে শূন্য ছড়ানো রয়েছে
গাদাগাদা শূন্য
শূন্য নুড়ি মোরামের পথে ছোট-ছোট গোল শূন্য
আকাশ নেমেছে এসে শূন্য হয়ে সমতলে
গাছের মাথাও গোল গুঁড়িটিও লম্বা তবু গায়ে গোল
খিদের প্রকৃত কোনও আকার থাকে না তাই
দু’হাতে পাথর উঠে এসেছিল কতদিন আগে
রাজ্য ভেঙে চুরমার হয়েছিল শর্তের দোহাই,
সামান্য জলের জন্য
মৃত্যুর পরেও পিতা সন্তানকে রেখে চলে যেতে চায় …

 

 

অনিকেশ দাশগুপ্ত

সাঁতার

তির্যক আলোর ঘুম কেটে উঠে এসেছে মাল্লারা
আলকাতরায় মেতে ওঠে হরিণ নিসর্গ

পল্লীপ্রবণ একাকী, সহস্র ভঙ্গিমার পিছনে
ট্যাভার্নের মৃত চোখ আদিম আঁধারের সংকেত
কেবলই ছেড়ে যায় তার বিস্মৃত আসন, হলুদ বন্ধনী

অগণন রেখাস্মৃতি ছড়িয়ে পড়ে আয়ুধ মেলে
অনন্ত বোধির মাঝে ফিরে আসে, ম্লান পেঁজা যেন
ফেরিঘাটের মতন নিবিষ্ট সফলতায়

হাট

অপেক্ষা করতে বলা এই আধখোলা স্নানাগার
থেকে ফিরে এল শুদ্ধ প্রতিধ্বনি, জল রোমাঞ্চের

বাজার গলির পাশে যেদিকে ক্রমশ ভিড় ক্ষীণ
একাকী পদচারণে সে কী তন্ময় বাদামি হোর্ডিং
একা দাঁড়িয়েছে এসে, আধো পরিচিত পরিচ্ছদে
হাঁ-খোলা নিসর্গে তু-তু ডাকি অশ্বমেধ বাসনাকে
হাওয়ায় ভেসে থাকে ভাষান্তরিত ডিঙি, চাঙর

বহুক্ষণ পর্যুদস্ত সে, অতীতে ফিরে যেতে যেতে
অপরূপ ডৌলে গিলে ফেলে দৃশ্যত তামাম ভূমা
যেন, পরবশ নয়, আবছায়া কথোপকথন
ঘুরপথে রৌদ্রমুখ কৈশোরে নিঃসঙ্গ চেয়ে ছিল,
আশ্বস্ত করি দৃশ্যকে স্বপ্নিল যাতায়াতের কোণে
গ্রীবার ঝলক যেন খুঁজে পাবে হিম জানালায়
কুঠারে, শৃঙ্গারে তবু এঁকেবেঁকে যায় চন্দ্রালোক

কবিতা আশ্রম প্রকাশনার বই। বাড়িতে বসে সংগ্রহ করতে চাইলে কভারে ক্লিক করুন।

“পথের ফসল”

অমৃতাভ দে

পর্ব-১১

সুজনপুরেই থাকেন নাকি
মনের মতন বন্ধু কজন
গঙ্গাপাড়ের হিমেল হাওয়ায়
রোদ ঝিলমিল ছবির মতন
কুন্দপুরের সবুজ বাগান
বিলের জলে নানান পাখি
সকালবেলার বন্ধু বলে,
‘সুজন হয়েই আমরা থাকি’

দিগনগরের পাশেই আছে
বাংলাদেশের অনেক সুজন
রঙের রেখায় পথের ছায়ায়
ওই শোনা যায় কোকিল-কূজন

অঞ্জনারই বন্ধু হয়ে
চন্দনী গ্রাম পথের বাঁকে
শিউলি সুবাস গল্প হয়ে
চূর্ণী নদী আমায় ডাকে।

দিঘির জলে শাপলা-পানা
আগলে রাখে স্বপ্ন মায়ায়
পদ্ম ফোটে রাণীর মত
দুর্গা আসে শীতল ছায়ায়।

বাড়ির পাশের গ্রামগুলো সব
সুজন হয়েই থাকবে দেখো
তোমরা এসো ভোরের আলোয়
সোহাগভরা পরাগ মেখো।

বাংলার গ্রামগুলোকে ভালবেসে এভাবেই ঘুরে বেড়ানো—খুঁজে চলি কবিতার আশ্রম। পথে পথে কবিতার পঙক্তি, পথে পথে কত না সোহাগ।

এবার চলুন রবিবাসরীয় সাইকেল ভ্রমণে আমরা ঘুরে আসি নদিয়া জেলার সুবর্ণবিহার থেকে। শিমুলতলা হয়ে আমরা পৌঁছালাম পঞ্চাননতলা। এই হরিশপুর পঞ্চাননতলা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর বিশ্রাম স্থান হিসেবে চিহ্নিত। বহু প্রাচীন বটগাছের নিচে পঞ্চমুখ শিবের মন্দির নির্মিত হয়েছে। জানা গেল খুব বেশিদিনের পুরোনো নয় এই মন্দির।প্রাচীন বটগাছের নিচে ভগবান শিবের অধিষ্ঠান মনে করে এখানে শিবের মন্দির নির্মিত হয়েছে। পাশেই গড়ে উঠেছে রাধাকৃষ্ণের মন্দির। রাধাকৃষ্ণের মূর্তির পাশে রয়েছে নিতাইগৌরের মূর্তি। অপরূপ সাজে সজ্জিত এই মূর্তিগুলো দেখলে মন ভরে যাবে। ছায়াসুনিবিড় এই স্থানটিতে আপনিও কিছু সময়ের জন্য শীতল হতে পারেন। পিছন দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী আজ আর নেই। কিন্তু বুঝতে ভুল হবে না সময় এখান দিয়ে বয়ে যেত জলঙ্গি নদী। এই পঞ্চাননতলায় সরস্বতী পুজার পরের মঙ্গলবার হয় পঞ্চানন শিবের পুজো এবং কালীপুজো। সেই উপলক্ষে উল্টোদিকের মাঠে বসে তিন দিনের জন্য মেলা। এই পঞ্চানন শিবের পুজো এবং কালী পুজোয় অনেক বলি হয়।

সেখান থেকে বাংলা ভাষা দিবসে আমরা আমাদের রবিবাসরীয় সাইকেল ভ্রমণে এমনই জায়গায় পৌঁছে ছিলাম যেখানে ওপার বাংলা থেকে বহু মানুষ এসে বসবাস করছেন বহুদিন থেকে। পূর্ববাংলার স্মৃতি তাদের অন্তরে।দেশভাগের সময় বিভিন্ন উদ্বাস্তু কলোনিতে থাকতেন তাদের আত্মীয়জনেরা। তারপর সরকারি সাহায্য পেয়ে নির্দিষ্ট জায়গা পেয়ে তারা তৈরি করেছেন তাদের বাসভূমি। দেশভাগের ক্ষত কোনদিন ভুলবার নয়,ভোলার নয় বাংলাদেশে ঘটে যাওয়া ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিও। বাংলাদেশের ভাষা আন্দোলন বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল। ভাষা আন্দোলনের হাত ধরেই স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। আজ এই ভাষা শহীদ দিবসে আমরা সুবর্ণবিহারের গৌরাঙ্গনগর কলোনীতে এসে ভারতবর্ষের স্বাধীনতা আন্দোলনের এক স্বাধীনতা সংগ্রামী যোগেন্দ্রনাথ পালের বাড়িতে পৌঁছালাম। সুবর্ণবিহারের গৌরাঙ্গ কলোনি আমাদের বাংলা ভাষা শহীদদের কথা বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিল… বাংলার গ্রাম বাংলার নদী মাঠ সবুজ বনানী আসলে বাংলা ভাষাকে প্রাণ দিয়েছে। বাংলার প্রকৃতির মধ্যেই আজ তাই আমরা বাংলার অন্তরের ভাষাকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করলাম…

সুবর্ণবিহারে আজ আমাদের সঙ্গী ছিল সুবর্ণবিহার গৌরাঙ্গনগর কলোনীর তাপস ও তপন। দুজনেই স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত প্রকৃতিপ্রেমী এবং মানুষপ্রেমী। দুজনেই ঘুরে দেখাল ওদের সাজানো গ্রাম। নিয়ে গেল ওর অরণ্যের ভিতর। একটি বাঁধানো পুকুর গল্প বলছে অসংখ্য গাছের সঙ্গে। শালের জঙ্গলে পাতা ঝরে পড়েছে। ছায়া বিছানো ‌পথ ধরে পৌঁছে গেলাম ফুলের রাজ্যে। কতনা ফুলের চাষ। মাঠ হয়ে উঠেছে বর্ণময়। পাশাপাশি শীতের সবজি। আলপথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি আমরা।তাপস,তপন বড্ড আন্তরিক। তাপস একটি বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ করে। তপন ফটোগ্রাফির শখ থেকে ফটোগ্রাফিকেই বিজনেস হিসেবে গ্রহণ করেছে। পাশাপাশি খেলাধূলাতে বিশেষ পারদর্শী। রক্তদান আন্দোলনের সঙ্গে ওদের নাম বিশেষভাবে যুক্ত। আজকের সাইকেল ভ্রমণে আমরা প্রথমেই দেখা করেছিলাম সাইকেলপ্রেমী রূপার সঙ্গে। ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার রূপা পাহাড়প্রেমী, পরিবেশপ্রেমী এবং একজন শিল্পীও বটে। ওর সাইকেলটির প্রতি আমাদের আজকে বিশেষ আকর্ষণ ছিল। মূলত সেটি দেখার উদ্দেশ্যেই আজকে আমাদের যাওয়া। নটি গিয়ার যুক্ত সাইকেলটি বড় আনন্দ হল। গ্রুপে মাঝেমধ্যেই কলকাতা যায় সাইকেলে। ট্রেকিং করতে ভালবাসে রূপা। গোচালা, রূপকুণ্ড সহ সিকিমের প্রায় প্রতিটি জায়গাই ট্রেকিং করে ফেলেছে। ওর নিজের হাতে তৈরি আসবাবেই সাজানো ওর ঘর আমাদের মুগ্ধ করল। গিটার বাজাতে ভালবাসে। ওদের ভালবাসার উষ্ণতা নিয়েই ফেরার পথ ধরলাম আমরা…

 

পূর্ববর্তী সংখ্যা