সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম ৭৭ তম সংখ্যা
সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ২ মাঘ ১৪২৮
প্রীতম সেনগুপ্ত
কালীখোলা
পাইন সারির নিবিড় আঁধার,
অগ্রসর আলোকিত কৃষ্ণ বাহাদুর।
পিপীলিকার সারি ও আমরা—
এলাচের ক্ষেত, লেটুস শাকের সবুজ।
পাথুরে উতরাই বন্ধুর পথ, সতর্ক পা দুটি।
অবুঝ কিশোরীর রহস্যময় আঁখি দুটি
রামপুরীধামের চক্রব্যূহে প্রবেশ করে।
কখন, কেমন করে নিষ্ক্রান্ত হবে কে জানে!
শ্রীরাধার অঙ্গ সুবাসে স্নিগ্ধ নাগকেশর অন্বেষণ,
চারিপার্শ্বে সন্নিবিষ্ট পাহাড়গুলি সূর্যালোকের সঙ্গে সাপলুডো খেলে।
একটানা জলীয় কলতান অতিক্রমান্তে কালীখোলা—
প্রস্তর লেহনকারী বহমান জীবন বিষণ্ণ আয়ান ঘোষকে হ্যাঁচকা টান মেরে ফিসফিসিয়ে বলে, মন খারাপ কোরো না, আমি তো আছি, চল আমার সঙ্গে…
মিমি সিদ্দিকী
কথায়-কথায়
বুকের ভেতর ছোট্ট টিলার দেশ
রং বদলায় তোমার কথার মেঘে,
ভাসতে ভাসতে ধানরং রোদনদী
বৃষ্টি নামল হঠাৎ নিরুদ্বেগে।
হঠাৎ আকাশ বৃষ্টি ভিজল খুব
হাওয়ায় হাওয়ায় মৌসুমি মেঘ ঢাকে,
সেই মেঘটাই লুকিয়ে বিকেল পাতায়
একমধুরং সন্ধ্যা রাখছে লিখে।
লিখতে লিখতে বিকেল মৌরিফুল
টিলায় টিলায় সোনার সন্ধ্যা ঝরে,
কে ভাসিয়ে দিচ্ছে আকাশপ্রদীপ
কথায় কথায় গোপন সরোবরে…
পৃথা চট্টোপাধ্যায়
পিছুটান
এল শীত, হিলহিলে শীত।
শীতের সকাল
কেন এত পিছুটান রাখে
পাখ-পাখালির দল চুপ
একা কাক বোবা চোখে দ্যাখে
আমিও বিমূঢ় হয়ে ভাবি
বারবার ছাদে যাই আকাশের নীলে রোদ খুঁজি
তোমাকে উদাসী লাগে তাম্রলিপ্ত দিনের মতন
কি যেন হারিয়ে গেছে গোঠের রাখাল
বাঁশি আছে সুর নেই
কাজ আছে মন নেই
দুই চোখে জমা করি জল
তোমাকে যমুনা দেব খুশির অতল
নীলম সামন্ত
খবরে এখন ‘ভেতর ঘর’
সিঁড়ি থেকে নেমে আরও কিছুটা এগিয়ে
কিছুটা জলে ভেতর
অনাবিষ্কৃত খাদানে তুমি বসে আছ৷
পাখির পালকের মতো এক একটা দিন খসে যায়।
রান্নার বউ ফ্রিজের দরজা খুলে শূন্যতা দেখালে
বুঝে যাই গোটা দিন ছেড়ে কেটে গেছে এক সপ্তাহ
কিংবা আরও কিছু দিন।
অভ্যেসের খাতায় দাবি ও অনিয়ম তুলে রাখতে গিয়ে
জায়গা করে দিই তোমার।
নতুন ঘরের৷
আদতে, আমার কোনও বাড়ি নেই।
এখান ওখান থেকে উৎখাত হতে হতে
ঢুকে পড়েছি নিজের ভেতর৷
ভেতর ঘরে।
যেখানে সূর্য নেই।
ধ্যানমগ্ন অথবা ঘুমন্ত চিঠির মতো
বসে আছে বিশ্বামিত্র মুনির খোলস।
তারও গভীরে তুমি।
ঠিক যেমন একটা কবিতার ভেতর অজস্র কবিতা।
সৌমক দাস
স্বপ্নের মায়াজাল
সামনের বড় রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে
নব্য প্রেমিক-প্রেমিকারা
নতুন স্বপ্নের মায়াজাল রাস্তাজুড়ে বেছান
উষ্ণতার আগুনে জ্বলছে
কিছু ভেঙে যাওয়া স্বপ্নের বুক
তারাও সুগন্ধি মাখান স্বপ্ন বিছিয়ে ছিল
হাতের ওপর হাত‚ চোখের উপর চোখ রেখে
দুহাত দিয়ে দু-চোখ রগড়াই আমি
চোখের কোণে দলা-পাকান
ছেঁড়া স্বপ্নের মায়াজাল।
পল্লব গোস্বামী
গোপন
অন্ধকারে বেড়ে ওঠা, রোদে পোড়া ঘাসও জানল না কিছু
আমাদের মধ্যে, কেউ কেউ কুয়াশাঘাট পেরোলাম
কেউ কেউ
ঘাড় নিচু,
মাথা নিচু
অসুস্থ রাতের পাশে কে আজ তারা হবে?
কে হবে পালক ওঠা পাখিদের পাশে হাসপাতালের গাছ?
আকাশে আগুন জ্বলে,
বিমর্ষ চিতাকাঠে বুক রাখে
রাতের শিশির
ভালবেসে, সন্ন্যাসিনী বেশে
কখন যে তুমি এলে!
কেউ জানল না কিছু
জানল শুধু,
বৃষ্টি রাতে ধুয়ে যাওয়া লাল পিঁপড়ের ডিম,
শালিখ ঠাকুর।
প্রসূন ঘোষাল
আপনি যোদ্ধা ছিলেন
মাথার মধ্যে সচরাচর যেটা আসে না
তখন দুহাতে মস্তিষ্ক চেপে ধরে
যে লোকটা তাকিয়ে ছিল আমার মুখের দিকে
মনে হয় রাতের বেলা চাঁদের তেজ কমে যাচ্ছে…
আপনি একবার জলের কুচো ঢেউয়ে
পা দিয়ে পুনরায় সরিয়ে আবার পা ডোবান—
এবার চোখের ঘন দৃষ্টির কাছে
ছোট এক গিঁটে মাছের যাবতীয় খেলা
দেখবেন স্পষ্ট ভাবনায় বৃহৎ মাছের সংগীত
আপনি যে বড় যোদ্ধা ভুলে যাবেন না
বাড়ির মাথায় ত্রি-রঞ্জিত পতাকা
ওপর দিয়ে যে পাখিটা উড়ে গেল
সে তো দিনের আলো কমিয়ে দিতে পারে না
ভুলে যাবেন না কর্মঠ কাঁধের পাশে
আপনার কর্মঠ ছায়া; দেখুন হাত দুটোর
ওপর চামড়ায় জয়ের চিহ্ন ভোলার নয়।
অমিত সাহা
কবিতা-প্রদীপ
নিক্ষেপের কাছে গিয়ে দেখি
একটি বল্লমও নেই…
আছে শুধু অনুশীলন-ব্যর্থতা!
সুতরাং আকাশের চাঁদ
সমুদ্রে বাউন্স খেয়ে
ছলকে ওঠে বুকে…
জোছনাবিলাসী ঢেউ বাউন্ডারি ভেঙে
ফিরে আসে ঝিনুকের পেটে!
আর স্বরবর্ণ-মুখাপেক্ষী তুমি
৯-কারের মতো তুলে নিচ্ছ শাঁখ
এক ফুঁয়ে জ্বলে উঠবে কবিতা-প্রদীপ!