সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম ৭৯ তম সংখ্যা
সাপ্তাহিক কবিতা আশ্রম, ১৬ মাঘ ১৪২৮
কবিতা আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা এবং মুখ্য পরিকল্পক বিভাস রায়চৌধুরী। কবিতা আশ্রম তাঁর স্বপ্নকে লালন করে। গত ১৩ মাঘ কবির জন্মদিনে ভালবেসে শুভেচ্ছা বার্তা স্বরূপ তাঁর বিভিন্ন কাব্যগ্রন্থের আলোচনা করেছেন। আবেগের সঙ্গে সঙ্গে যুক্তিও সম্ভবত এটাই যে তাঁর লেখা ভালবেসেই তো তাঁকে ভালবাসা! অনেকে কবিতায় শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সেই সব লেখা নিয়েই আজকের সাপ্তাহিক বিভাস রায়চৌধুরী সংখ্যা।
কবি বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতা ও কবিতা জীবন
প্রতিদিন জন্মদিন। বিভাসের জন্য
নির্মল হালদার
আমার মনে আছে, আমি একদিন বিভাসের সঙ্গে ফোনে আলাপ করেছিলাম। তাকে আমার প্রথম ফোন। আলাপ করতে করতে আমি সহজ হয়ে গেছিলাম। কথায়। এবং প্রথম দিনেই জেনেছিলাম, তার মেয়ের নাম মৃত্তিকা।
তখনই বুঝেছিলাম, মাটির সঙ্গে বিভাসের যোগাযোগ আছে। যে যোগাযোগ থেকে আমার সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা হতে দেরি হয়নি। আলাপের কিছুদিন পরেই, পুরুলিয়াতে আমাদের এক সাহিত্য অনুষ্ঠানে তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। সে তার দলবল নিয়ে এসেছিল।
আস্তে আস্তে বিভাসের জীবন দর্শন ও কাব্য দর্শনের সঙ্গে পরিচিত হই। তার কবিতার সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ হতে থাকি। সে সব সময় মানুষের জন্য প্রকৃতির জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছে, একথা স্পষ্ট করেই বলতে পারি। তার উদাহরণ তো তার কবিতার বই গুলি। তার কবিতা থেকে হৃদয়ের স্পন্দন পাই। এবং একটা চাপা ক্রোধ, এই সমাজ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তার সঙ্গে একটা চাপা কান্না। শুনতে পাই।
আজ এই লেখা লিখতে লিখতে বিভাসের কাছে দাবি করছি, সে যেন আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে। বিভাসের বনগাঁ আমার পুরুলিয়া এক হয়ে বন্ধনহীন গ্রন্থি। একই সুরে বেঁচে থাকব আমরা, ফ্যান-ভাতের গন্ধে।
ছন্নছাড়া জীবনে জ্বলে ওঠা কবিত্বের দীপ ও বদ্বীপ
জয়দেব বাউরী
কবিতা কীভাবে আসে জীবনের কাছে?
সঠিক জানিনা। দেখি আসে। এসে থেকে
যায় সহজ স্বভাবে। মাটিতে কাঁকরে
বীজ, যেমন ছড়িয়ে থাকে নানা ভাবে
অতলের ঘুম-সহ সম্ভাবনা নিয়ে;
কবিতাও সেভাবেই মানুয়ের হৃদ-
মৃত্তিকায়, ভেতরের প্রকৃতিতে থাকে?
আর, এক অনবদ্য বর্ষা নেমে এলে
সবুজে সবুজ হয়ে চোখ খোলে, নাচে।
আনন্দে দুহাত তোলে। দাড়ায়। ভাসায়।
হিল্লোলিত করে রাখে চরাচর, ভূমি।
জানিনা, জানিনা, ঠিক সে চির রহস্য
এক। শুধু মনে পড়ে যখন কবিতা
আসছে আমার ভিতরে, অদ্ভুত জ্বরের
ঘোর নিয়ে, মানে সেই প্রথম প্রেমের
বেলা, কলমের কাল, যখন ক্ষ্যাপাচ্ছে
সব সেকেন্ড ইয়ার, কলেজ কলিরা
তখন, হ্যাঁ, তখনই এক কবিতা পেলাম,
মনে হল একেবারে আমার জন্যই
লেখা! নাকি কবিতাটা আমারই, শুধু
বেরিয়েছে অন্য কারো সোনার কলমে।
সারোগেট মাদারের মতো? জানি না তো!
তবে পুরো কবিতাটা নয়, ওই এক
দুই এমনই ক’জোড়া এক উৎসারিত
আলোর বল্লম! যেন বুক তুলে নিয়ে
ছুঁড়ে মারি ‘কবি কবি’ বলে দিনরাত
ক্ষ্যাপাচ্ছে যেসব ছোড়াছুঁড়ি, প্রতিবেশি
তাদের হৃদয় তাক করে ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারি।
-“ক-অক্ষর চাবুকের খ-অক্ষর ছোরা
আমাদের ‘কবি’ বলে খ্যাপাত না ওরা?”
ক্ষ্যাপায় ক্ষ্যাপায়! কিন্তু মোক্ষম জবাব
সহ আমি কেন এরকম লিখতে পারিনা!
যেন মন্ত্র! ঠিক ঠিক পড়ে দিলে ভস্ম
হবেই, নিশ্চিত। কিন্তু এসব ঘটেনি –
“চালাঘর ভেঙে দিত, লেখা ছিঁড়ে ফেলে
মনে মনে ভেবে নিত মরে গেছে ছেলে”
না না এতটা করেনি কেউ দুঃসাহস
করে। তবে আরও এক জোড়া পঙ্ক্তি পরে
-“বলো, বলো ইতিহাস? লেখা মরতে পারে?
যুগে যুগে জন্মে প্রেম নদীর কিনারে”।
জন্মায় তো! কতশত, অত্যাচার, মার –
মেরে ফেলা তবুওতো প্রেম প্রেম করে
প্রেমিক প্রেমিকা আসে, নতুন নতুন
সব বাধা ভেঙেচুরে বছরে বছরে।
আর লেখা? লেখাও তো মরে না কখনো।
সেই যে ‘পথের দাবী’, নজরুল, তসলিমা
কত যে পুড়েছে বই! মরে গেল? মরে
গেল লেখা? স্তব্ধ হল গঙ্গাজল ধারা?
হয়নি, হয় না বলে লেখা আসে,ইতিহাস
সে কথাই বলে। আর নতুন উদ্দাম
শক্তিতে ভরপুর হয়ে নতুন দিগন্ত
উন্মোচিত করে যায় তরুণ কলম।
-“ক-অক্ষর ফুলে ফুলে… খ-অক্ষর পথে…
লড়ছে প্রেম পথেঘাটে, অরণ্য-পর্বতে”।
তাই ওদের কথায় কিছু যায় আসে
আর? আসে না আসে না। নিজের সপক্ষে
এসে দাড়িয়েছে আজ, এই এক লেখা
-“মুগ্ধ হয় সব গাছ, সব পাখি, ঘাস…
ভাষা জানে মনোমুগ্ধ বাউল বাতাস…”
ওইসব প্রতিবেশি, প্রাক্তন দাদারা,
বাংলা অর্নাসের ওই শালিখের ঝাঁক—
এরকম অনুভব ওদের কি আছে!
শুধু প্যাঁক! লিখি বলে এত প্যাঁক, টোন !
“বাঙালির ঠোঁটে প্রেম ওল্টালেই ছোরা
আমাদের কবি বলে খ্যাপাত না ওরা?”
নিজেকে উজাড় করা যেন এক লেখা।
প্রথম লেখার কালে ঠিক এভাবেই
পেয়েছি বিভাস রায়চৌধুরীর এই
কবিতাকে। বুঝিইনি ‘আটই ফাল্গুন’
তারিখের বিশেষত্ব, এর গুরুত্বই
বা কতখানি, কীরূপ? যেহেতু বাংলার
ক্যালেন্ডার ঘরে ঘরে ক্রমশ শ্রীহীন
হয়ে পড়ছে আমাদের জীবনে, যাপনে।
(পয়লা বৈশাখ আর পঁচিশে বৈশাখ
বাইশে শ্রাবন বাদে) তাই ইংরেজির
তারিখের সঙ্গে এই বাংলা তারিখটি
মিলিয়ে উঠতে পারিনি। যেহেতু ভেতরে
গেঁথে গিয়েছিল, তাই বাসে, সাইকেলে
হেঁটে যেতে কবিতার জোড়া জোড়া পঙ্ক্তি
গুলি ঝড় তুলতো বুকে। এভাবেই এল
ফেব্রুয়ারি মাস। এবং মহান একুশে।
আটই ফাল্গুন মানে একুশের ভোর!
এইবার কবিতাটি আরও উন্মোচিত
হতে থাকল রোজ – “বলো, বলো ইতিহাস
লেখা মরতে পারে’’—ইতিহাস কথা বলে
ওঠে। মর্যাদার কথা, লড়াইয়ের কথা,
রক্তে রাঙানো নতুন সূর্যোদয়, বাংলা
ভাষার প্রীতির কথা প্রতিধ্বনি তোলে
বুকের ভেতর, আর বুঝতে পারি কবি
তাঁর টালমাটাল কবি জীবনের সেই
অশান্ত, উদ্দাম তীব্র সংকটের দিন—
রাত্রিগুলি কী আশ্চর্য ভঙ্গিতে মিশিয়ে
দিয়েছেন এই ভাষা-প্রেম কবিতায়!
“চালাঘর ভেঙে দিত, লেখা ছিঁড়ে ফেলে
মনে মনে ভেবে নিত মরে গেছে ছেলে…”
আরও আপন হয়ে উঠল কবিতাটি-
“ফাল্গুনের পাগলা দিন কবি কবি গাছে
যুগে যুগে লড়াইয়ের লগ্ন হয়ে আছে…”
প্রায় দুদশক আগে এই কবিতাটি
দিয়েই কবি বিভাস রায়চৌধুরির
কবিতার সঙ্গে আমি পরিচিত হই।
কিন্তু কীরকম ছিল নব্বইয়ের প্রিয়
এই কবির উন্মেষ পর্ব? একবার
তাকাব পিছন ফিরে, তার সেই ‘নষ্ট
প্রজন্মের ভাসান’র আলোটির দিকে।
২
কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতাটি যেন আত্ম-উদবোধনী সঙ্গীতের মতো।
জল থেকে যেরকম ধীরে ধীরে জেগে উঠেছিল এই সসবুজ স্থলভূমি,
কবিত্বের উপত্যকা যেন সেভাবেই জেগে ওঠা অল্পখানি চর মাত্র,
যিনি সেই ‘উদয়ের প্রান্তরের প্রভু।‘ কিম্বা অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে
অ-কবি জীবন থেকে কবি-জীবনের দিকে যাত্রার মাঝখানে শুয়ে আছে
এক নদী যার এপার থেকে ওপারে গেলেই,কবিত্বের পথে গিয়ে
ওঠা যায়। কবিতাটি শুরু হচ্ছে এরকম এক চিত্রকল্পের আবহে।
-“নদী সাঁতরে উঠে এসে দেখি আমার শরীর ভেসে গেছে জলের সংজ্ঞায়…
নদী সাঁতরে উঠে এসে দেখি একটি বিচ্ছিন্ন হাড় পূর্বের চুল্লি থেকে দূরে…”
এই জলের সংজ্ঞায় ভেসে গেছে কার দেহ? অ-কবির? কারই বা বিচ্ছিন্ন হাড়
চুল্লি থেকে দূরে পড়ে আছে? সেই অ-কবির? কবিত্বেরই অবয়ব থাকে নাকি?
পরবর্তী পঙতিগুলি আসে অবচেতনের কুয়াশায় কুয়াশায় ছড়ছড় ভোর
মেখে।সেই হাড় চিরে বেরিয়ে আসছে অক্ষর,কবি জানাচ্ছেন- “কোনো সূত্র
ছাড়াই আমি এ রচনা এঁকেছি”। তবে কী এই উদবোধনে কোন পূর্বাপর
অনুষঙ্গ বিজড়িত ছিলনা কখনো? কোনো প্রভাব অথবা স্বপ্নাদেশ?
-“আমি প্রভু গেলাম, বৃক্ষ তার কাছে ক্ষমা চায়”। তবুও “আমার
শবদেহ ছুঁয়ে একটি বৃক্ষের শেকড় মৃত্যুর বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে”
কেননা এতটা কাল, এত এত কাল “তার হলুদ হয়ে আসা শেকড়/
পাতালের ঘোর,অবিশ্রান্ত ঘুম দেখে অভিজ্ঞ”; পাতালের ঘোর
অতল জলের মধ্যে ডুবে থাকা পৃথিবীর জেগে ওঠবার মতো করে
জেগে ওঠে মানুষের কবিসত্ত্বা,সৃষ্টিসত্ত্বা অবিশ্রান্ত ঘুম থেকে যেন।
অথচ হলুদ হয়ে আসা তার শেকড়টিও চায় “মৃত্যুর অবর্ণনীয়
চোখ খুলে/সেই বিশ্বত্ব খাদে স্রোতের আর্তনাদ জাগিয়ে দিই,/
ভয়ংকর গতিতে সে লাফিয়ে পড়বে –
“আর একটি নিশ্বাস গড়িয়ে পড়ার মতো চকিতে সব যায়”।
বিদ্যুৎ খেলার মতো আত্মার উদ্বোধন তবে এভাবেই ঘটে!
উদ্ভিদের জেগে উঠে দাঁড়াবার মতো এই সৃজনী শক্তির জাগরণ।
তাই, কবি দেখি এই উপলব্ধিতেই পৌছে সেখানেই থিতু হতে চান –
“একটী বৃক্ষ ও কবির /জন্মান্তরের ইতিহাস ইতিহাস এক” আর সেই কবিত্বের
প্রান্তরের নিয়ন্ত্রক স্বয়ং কবি ,(প্রভু ) তিনি নিজেই নিজের জেগে ওঠা
উদয়ের প্রান্তরকে কী কী বর্ণে সাজাবেন ঠিক করবেন তিনি নিজে।
আমি যতবার যাই এই কবিতার কাছে প্রতিবার নিজেকে হারাই,
ক্রমশ তলিয়ে গিয়ে চুপ করে বসি থাকি এর ছড়ছড় কুয়াশার ভোরে।
[দীর্ঘ কবিতার নির্বাচিত অংশ]
শুভ জন্মদিন, বিভাসদা। ভালো থাকুন। লড়াই চলুক। শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
কবিবন্ধু বিভাসের অসামান্য দাউদাউ
অশোক তরু
“জীবন যতটা মধু, তার চেয়ে বেশি কিন্তু মোম !”— কবি বিভাস রায়চৌধুরী
বিভাস রায়চৌধুরীর ‘আমার সামান্য দাউদাউ’ চার পর্বে সজ্জিত কাব্যগ্রন্থটি এক চুমুকে গিলে ফেলা যায়, তারপর শুরু হয় তোলপাড়। তার সুফি-কথনের মুগ্ধতায় আমাদের অন্তরে আশ্রয় নেয় একটি কথার অনুরণন “ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা খোঁজে না… ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা খোঁজে না… ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা খোঁজে না…” বিভাস রচনা করেন জীবন । আত্মকথনের ভঙ্গিতে বলে চলেন, “তোমার মাটি, গোপন গৃহের গাছ/ আমার নদী পছন্দ করল না…” এ যে একলা কবির গান! গীতিকবিতার প্রাণ অনুভূতির তীব্রতা। ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাস কেবল ব্যক্তিগত স্বার্থে সীমিত না থেকে যখন তার আবেদন সর্বজনীন হয়ে ওঠে তখনই তার সার্থকতা। বিভাসের ‘আমার সামান্য দাউদাউ’ কাব্যগ্রন্থটির প্রথম এবং দ্বিতীয় পর্ব গীতিকবিতার একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। তার ব্যক্তিগত অনুভূতির তীব্রতার জন্য এতে এমন এক নিবিড় আত্মময়তা স্থান করে নিয়েছে যা অনুভূতিশীল পাঠককে প্রবলভাবে স্পর্শ করে।
বিভাসের কবিতার আপাত সরলতার গভীরে জীবন-বোধ পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে। সেরকমই একটা কবিতা।
“দুঃখগুলো পার হয়ে আসি।
মরা ডালে পাতা গজানোর দিনে বুঝি
মনেই পড়ে না—
দুঃখ এক শাশ্বত বিষয়…” (‘প্রবল বৃষ্টির পর’)
এই প্রসঙ্গে মনে পড়ে William Blake এর ‘Joy ’ কবিতার শেষের তিন পঙ্ক্ত,
‘Man was made for joy and woe;
And when this we rightly know,
Safely through the world we go.’
বিভাস নিরাশাবাদি নয় । আশা-নিরাশার দ্বন্দ্ব তাঁর কবিতার বিশেষ লক্ষণ। তিনি জারী রাখেন জীবন যুদ্ধের লড়াই। নিশ্চিহ্ন হয়েও যিনি বলতে পারেন আমি, কিন্তু হারিনি…
আমার ভেতর
যেসব আপত্তি ছিল
সব মেরে ফেলতে পারিনি…
কী হবে? জানি তো
ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাওয়াই নিয়তি !
তবু এই মানুষের জীবনকে বলবার কিছু আছে—
‘নিশ্চিহ্ন হয়েছি, ঠিক…
কিন্তু আমি হারিনি… হারিনি…’ (‘স্বভাব’)
এই বইয়ের যে কবিতাগুলি আমাকে মুগ্ধ করেছে, সেগুলি ‘নীললোহিত’ (প্রয়াত সুনীল গাঙ্গুলীকে স্মরণে রেখে বলেছেন, ‘ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা খুঁজে না/ দুঃখীদের জড়ো করে, আর/ ক্ষতচিহ্ন মুছে দেয় সব…/ জানে শ্রেষ্ঠ অশ্রু-ব্যবহার…’), ‘তোমার অসীমে’ ‘আমার শুধু হাওয়া’ ‘অমৃতা’ ভাঙা ভাঙা অক্ষরবৃত্তে লেখা । ছন্দের গতি অবাধ ও মন্থর, স্বাচ্ছন্দ এবং গম্ভীর । অবশ্যই ‘ রিপু-করা জিনসের শার্ট’ এই দীর্ঘ কবিতাটি পাঠকের মনোযোগ আকর্ষণ করার দাবি রাখে । এছাড়া ‘পাগল রঙের সর্বনাশ’ শীর্ষক কাব্যনাট্য ধর্মী কবিতায় বাস্তব থেকে পরাবাস্তবের উত্তরণ মোহিত করে রাখে। ঘোর যেন কাটে না!
৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹৹
কাব্যগ্রন্থ: আমার সামান্য দাউদাউ
প্রচ্ছদ: যোগেন চৌধুরী
ঐহিক প্রকাশনী
‘এই তো আমার কাজ’: আত্মার ওপারে চাঁদের আলোর হাতছানি
কুমারেশ তেওয়ারী
‘আমার সামান্য দাউদাউ’ পেরিয়ে’, ‘অনন্ত আশ্রমের’শান্ত ছায়াবিথীতলে বসে যিনি ‘এই তো আমার কাজ’-এর কথা ভাবতে ভাবতে নিবিড় বন্ধনে জড়িয়ে ধরতে পারেন এই পৃথিবীর আলো-ছায়া-মায়াকে, সেই কবি বিভাস রায়চৌধুরীর জন্মদিনে অনন্ত শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়ে কিছু কথা।
যে কোনো কাজ হাতে নিলেই প্রথম যে প্রশ্ন, চিন্তা বা ভয় বুকের ভেতরে ধাক্কা মারে তা হল কাজটি ঠিকঠাক করতে পারব তো? বিশেষ করে সেই কাজ যদি হয় বিভাস রায়চৌধরী-র সাম্প্রতিক কাব্যগ্রন্থ “এই তো আমার কাজ”-এর কিঞ্চিৎ আলোচনার লোভ। লোভ বললাম কারণ কেউ আমাকে তো দিব্যি দেয়নি বইটি আলোচনা করার। বইটি পাঠ করতে করতে হৃদয়ের তারে যে টুং শব্দের উৎপত্তি হয়েছিল কোনো একদিন সেই শব্দই আমাকে বাধ্য করছে অন্তত কিছু শব্দে এই বইয়ের কবিতাকে ধরতে। যদিও সেই ভয়, পারব কি? কারণ এই কাব্যগ্রন্থ যিনি পাঠককে উপহার দিয়েছেন তিনি আর কেউ নন, তিনি বিভাস রায়চৌধরী। বর্তমান কাব্যজগতের এক মহীরুহ। তবু কিছু কিছু কাজ থেকে আনন্দ পাওয়ায় আকাঙ্ক্ষায় সাহায্য করে ভয়কে জয় করতে। সুতরাং ছোটোবেলায় সেই পড়া একটা পঙক্তি ‘ভয় করলেই জয় হয়’ এই আপ্তবাক্যে বিশ্বাস রেখে একটু খুঁজে দেখা যাক।
“সব ভালো যার শেষ ভালো” মানুষের কথ্যমুখে এই বহু প্রচারিত শব্দগুচ্ছ যেমন সত্য তেমনই আমি মনে করি ‘সব ভালো যার শুরু ভালো’ এটিও এক পরম সত্য কথা। কেন ভাবলাম একথা বইয়ের প্রবেশক কবিতাটিকে ছুঁয়ে দেখবো বলে। এই যে প্রবেশক কবিতা যেখানে কবি বলছেন ‘আলো পোকা থেকে জন্মায়’, এই একটা পঙ্ক্তিই যেন মুহূর্তে বইয়ের সমস্ত কবিতাদের মুখপাত্র হয়ে বেঁধে দিল যে মুখরার সুর, তা যেন বাকি কবিতাদের আহ্বান দিয়ে রাখল সঞ্চারি-তে শীতল সন্তরণের। আবার দেখুন কী ভীষণ বহুমাত্রিক এই উচ্চারণ। আপনি যেমন ভাবতে পারেন এই যে আলো যাকে আমরা উচ্চাসনে রেখেছি। যাকে নিয়ে এত গান, কবিতা, কথা, সেই আলো কিন্তু সামান্য পোকা থেকে সৃষ্ট। অর্থাৎ আলোর উৎপাদক ওই পোকা কিন্তু সামান্য হয়েও যেন অসামান্য। অর্থাৎ কবি প্রকারান্তরে আমাদের চোখে যে অবহেলিত, তাদেরই জয়গান গান গাইলেন।
আবার আপনি ভাবতেই পারেন, উচ্চাসনে বসে যে আলো কিঞ্চিৎ অহংয়ে ভোগে সেই আলোর বংশপরিচয় কিন্তু সেই গ্রাসরুটেই লেখা। সেখানেই তার শেকড়বাকড়।
যাই হোক মুখরা ছেড়ে এবার সঞ্চারিতে ঢুকলে কী পাচ্ছি একবার দেখে নিই। ‘তুমি’ কবিতায় কেন বললেন কবি ‘একটি নির্জন রাস্তা,/ ঘুমের বাইরে এসে/ যে আমাকে চিনতে পারেনি আর কোনোদিন’। এ কি কবির অভিমান? প্রচণ্ড কোলাহলে বিরক্ত তিনি হয়তো চেয়েছিলেন নির্জনে বসে নিজের সঙ্গেই একটু কথা বলতে। অথচ সেই নির্জন রাস্তা কবিকে চিনতেই পারেনি। ঢুকতেই পারেনি কবির মনে। এখানেই কবির অভিমান।
আবার বৃক্ষপ্রেমিক কবির হাহাকার ফুটে ওঠে যখন তিনি বলেন, ‘পাখি ওড়ে—পাখি ওড়ে—/গাছ নেই—গাছে গাছে বাসা হারাবার ভোরে’। মুহূর্তে একটা চিত্রকল্প জেগে ওঠে চোখের ভেতর। সবুজে সবুজ অরণ্যে শুধু গাছ আর গাছের ভিড়। সেই গাছের ভিড়ে খাবার ঠোঁটে ফিরে আসা পাখিরাই খুঁজে পাচ্ছেনা নিজেদের গাছ, বাসা। আর এখন ‘পাখি ওড়ে’। বসবে কোথায়, গাছ নেই ডাল নেই। আছে শুধু মানুষের লোভ।
তবে এই হাহাকারেরও পতন আছে। এই হাহাকার থেকেই আবার জন্ম নেই আশা। যে আশাকে আলো বলি। তাই তো কবি বলছেন ‘শাখা থেকে দুই পাখি/শান্তভাবে ওড়ে—/পাতাকে ঝরাচ্ছে গাছ বৃষ্টির ভেতরে। কী অসাধারণ ভাবনা! সত্যিই তো পুরনো পাতা না ঝরালে আবার নতুন পাতা আসবে কীভাবে? কীভাবেই বা পাতার ছায়ার ভেতরে ওড়াউড়ি করবে পাখি? এই তো আশা যা আমাদের বাঁচিয়ে রাখে। প্রকৃত কবিই তো তা জানেন কারণ তিনি সত্যদ্রষ্টা।
তাই তো কবি বলছেন ‘কষ্ট হওয়ারই কথা/ কষ্ট পাচ্ছি খুব/ কিন্তু আমি স্বীকার করব না, তুমি একা পারো’। এই ‘তুমি’ কে? কবির প্রেম নাকি তার ঈশ্বর? যেই হোক, যদি প্রেম হয় তবে কবি যে প্রেমের উনুনের অথবা আগুনের কথা জানেন সেই প্রেমও হয়তো সে বিষয়ে উদাসীন। আবার এই ‘তুমি’ যদি ঈশ্বর হয় তবে সেই ঈশ্বরও হয়তো জানে না আমাদের চারদিকে জ্বলে যাচ্ছে কত ক্ষিদের উনুন। কবি জানেন। সব হয়তো অপারক তবু ভাবেন সেই উনুনের কথা। তিনি কবি তাইতো বলতে পারেন— ‘…আত্মার ওপারে চাঁদ উঠলে/ তোমার কথা আমি ভাবি’। তাই তো তিনি বলতে পারেন ‘দূর লিখে দিবি তুই?/ সুদূর লিখবি? আয়!’। এই যে কবি দূরের কথা লিখতে বলছেন, কারণ তিনি জানেন ‘দূরত্বদের লিখতে লিখতে/ ভালোবাসা পেয়ে যায়?’। কী চিরসত্য কথা। প্রকৃত দূরত্বই তো জন্ম দেয় প্রকৃত ভালোবাসার। যে ভালোবাসা দূরত্বের ভেতর থেকে বের করে আনে নিকটকে।
আবার ‘…আলো ভালো লাগে না আমার/ কাঁদতে ভালো লাগে’। ‘ব্যাধ’ কবিতায় কেন কবি একথা বললেন? তিনি তো প্রথমেই আলোর কথায় বলেছিলেন। যার জন্ম পোকা থেকে। তবে কি এ কবির দ্বিচারিতা? অবশ্যই না। একটু ধৈর্য নিয়ে পরের লাইনের দিকে যান, দেখুন কী অসম্ভব প্রত্যয় নিয়ে কবি বলছেন ‘দৌড়তে দৌড়তে কাঁদলে নিজেকে বৃষ্টি মনে হয়’। এই বৃষ্টিই তো প্রাণ। যে প্রাণের তাগিদে, কবি ‘অন্ধকার মুখে নিয়ে’ দৌড়তে দৌড়তে বৃষ্টি হতে পারেন। আর কে না জানে এই বৃষ্টিই সৃষ্টিতত্ত্বের আদিম ও অমোঘ বস্তু।
যে সৃষ্টিতত্ত্ব জানে শুধু সৃষ্টির নিয়ম। সেখানে কে জিতলো কেই বা হারলো তা নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। যেমন নেই কবির। তাই তো তিনি ঈষত ব্যাঙ্গের সুরে বলেন ‘পৃথিবী জানেনা তার কী হবে নিয়তি,/ মানুষ হিসেব করে/ জয়-পরাজয়’।
কবি শুধু জানেন ‘বেঁচে-থাকা কোনো না কোনো প্রস্তুতি’। কতটা দার্শনিক হলে এভাবে ভাবা যায়! সত্যিই তো জন্ম-মৃত্যুর অমোঘ নিয়মে বেঁচে থাকা তো প্রস্তুতিই। এই প্রস্তুতি ঠিকঠাক সারা হলেই তো আমরা চড়াই-উৎরাই ভরা জীবনের পথে হেঁটে যেতে পারি। কত ভুল হয়ে যাওয়া সত্বেও ‘তোমার শেকড়’ মাথায় জড়িয়ে হেঁটে যেতে পারি সেই পথে।
এই বইয়ের অন্যতম সম্পদ তার ‘ভেজা জামগাছ’ শিরোনামের দীর্ঘকবিতাটি। নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত কবি যখন প্রথম পঙ্ক্তিতেই বলছেন ‘আমার কিছু মনে নেই মনখারাপটুকু ছাড়া’ তখন মুহূর্তেই পাঠক হিসেবে আমারও চোখের কোণায় কি নোনা অশ্রু চিকচিক করে উঠছে না। কবির ব্যথার সঙ্গে একাত্ম হতে হতে কোথাও কি মনে হচ্ছে না ‘আমার আর কিচ্ছু মনে নেই ঘামের গন্ধটুকু ছাড়া’। এই ঘাম হয়তো আমার মায়ের শরীরের কষ্টের ফসল অথবা আমার বাবার পরিশ্রমের উপহার অথবা ওই যে ছেলেটি আর মেয়েটি ‘জলের ধারে/ ঘন হয়ে বসে কি কথা বলছে’-র সেই মেয়েটির ঘাম। কবির হয়তো প্রচণ্ড ইচ্ছে সেই ঘামগন্ধ ফিরে পেতে আরবার কিন্তু অভিমান কবিকে ফিরতে দিচ্ছে না। কবি পালিয়ে পালিয়ে কাটিয়ে দিচ্ছেন বাকিটা জীবন। শুধু চাইছেন সমস্ত জলের পাশে বীজ হয়ে থেকে যেতে। অর্থাৎ এত সবের পরেও কবির কিন্তু সেই পুনর্জন্মেই বিশ্বাস। তিনি ফিরে আসতে চান এই পৃথিবীতেই। আর সেইজন্যেই হয়তো কবি এতটা প্রত্যয় নিয়ে বলতে পারেন ‘কবি ও কালপুরুষ/ দেখা করে শুনশান রাতে’ কারণ তিনি জানেন ‘দূরের আলোকবিন্দু/ ক্রমশ নির্জন ক্ষত’ সেই ক্ষত তো একদিন সেরে যায়। সেখানে আবার একদিন প্রবাহিত হয় রক্তবাহি শিরা দিয়ে রক্তের ধারা। হয়তো এও এক পুনর্জন্ম।
পলাশপারের দেশ থেকে, এক সামান্য অর্ঘ্য
তমাল বন্দ্যোপাধ্যায়
“ক-অক্ষর চাবুকের খ-অক্ষর ছোরা…
আমাদের কবি বলে ক্ষ্যাপাত না ওরা?”
সেই ক্ষ্যাপানো ‘কবি’-দের বুকভর্তি অভিমানের পাশে, মফস্সলের হেরে যাওয়া জীবনের, সাজানো তবের বাগানভরা ডালিয়া-র জীবন মেনে নিতে না চেয়ে, এই রূপসী বাংলার বুকে ‘বিবাহ নিমিত্তমাত্র! সন্তানেরা যেন বাংলা বলে…’ ডাকের সাহস জোগানো, ভাষার আবেগ আর কবিজীবনের রক্তঅশ্রুর সমাহারে সাজানো এক আশ্চর্য চিরকবিতার নাম “শিমুলভাষা, পলাশভাষা”।
অনেক ব্যর্থতার হতাশার চাবুক খেতে খেতে ‘আর সহ্য করতে পারি না সাদা দেয়াল’ বলার স্বীকারোক্তি থেকে সীমান্তপরের দেশে গড়ে ওঠা আত্মহত্যাপাড়ার কলোনিজীবনের যত খুঁটিনাটি, যার ‘ভাষা জানে প্রকৃত কারণ’, সেসবের বুককেমননের দলিল, আত্মহত্যাফুল ফোটানোর শিশিরসকালের মতো একদিন, ‘সখী, এই কুঞ্জবন পেয়ে গেছি চাকরির বদলে’ বলে ফেলার প্রতিস্পর্ধা নিয়ে, মাত্রাগোনা জীবনের বাইরের নোয়াখালী-যশোরের স্মৃতিজন্মের পারে ছুটতে ছুটতে পেয়ে যাওয়া ঝর্নার দেশে এসে বুকের ভেতরে গান খুঁজে বেড়ানো মানুষটা পেয়েছেন কবিতার অনন্য উপশম। ‘ভাঙা বাংলা জোড়া লাগলে ভেঙে যাবে আমার অসুখ…’-এর উচ্চারণ নিয়ে পথহারা বাংলা ভাষার সব কবিদের ভিটেমাটির সন্ধানে অক্ষরভেলায় ভেসে বেড়াচ্ছেন কবি। তাঁর ‘কবিতারা সাক্ষী আছে’, সাক্ষী আছে বাইশে শ্রাবণ, আটই ফাল্গুন আর এই আজকের তেরোই মাঘ।
শুভ জন্মদিন, প্রিয়বর। শুভ জন্মদিন, কবি বিভাস রায়চৌধুরী।
‘চণ্ডালিকাগাছ’: পাতায় পাতায় বেজে ওঠা সুরতরঙ্গ, কখনো প্রেম, কখনো জীবনই তার মূর্ছনা
পারমিতা ভট্টাচার্য
সালটা খুব সম্ভব ২০০৭-০৮, চোখে পড়ল একটি কবিতা, ‘রবীন্দ্রজয়ন্তী’: প্রিয় কবি বিভাস রায়চৌধুরীর আট লাইনের একটি ছোট্ট কবিতা। মাঝে মাঝে কী যে হয়ে যায়, নিমেষে মন চলে গিয়েছিল ১৯৯৩-৯৪ এর দিনগুলোতে! ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ; বাবা ততদিনে ‘নেই’ হয়ে গেছে, দমচাপা কষ্ট, আর ভবিষ্যৎ বেশিটাই অনিশ্চিত। টিউশনির টাকায় কলেজ স্ট্রিটে কবিতার বই, লিটল ম্যাগাজিন কিনি। তখন ওটাই ছিল সর্বোচ্চ আনন্দের উৎস। …২০০৭ এ যখন জীবন অনেকটাই সুরক্ষিত, চোখে জল এনে দিয়েছিল ওই আট লাইনের কবিতাটি। ‘চণ্ডালিকাগাছ’―এই বইটা পড়ার সময় থেকেই ভেবেছি, কোনোদিন এ নিয়ে কিছু লিখব কোথাও। তারপর কবিতা আশ্রম সূত্রে কবে বিভাসদা হয়ে উঠেছেন আমাদের কাছের মানুষ। আজ কবির জন্মদিনে অনেক শুভেচ্ছা জানিয়ে, ‘চণ্ডালিকাগাছ’ সম্বন্ধে একটু লেখার সাহস করেই ফেললাম।
…………………………………………………….
“ছোট্ট একটা শ্বাস।
চণ্ডালিকাগাছ।
পথের পাশে বেঁকে
অজানা প্রত্যেকে।
প্রতিটি পঙ্ক্তিতে
শরীর নিতে নিতে
তুই কি আমার হোস
যামিনী রাক্ষস?…”
‘চণ্ডালিকা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ দেখি, ‘সেতার বা বীণা জাতীয়, একাধিক তারবিশিষ্ট এক বাদ্যযন্ত্র’.., ‘চণ্ডালিকাগাছ’ এই কাব্যগ্রন্থের নামেই, লহমায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক বনস্পতি… পাতায় পাতায় বেজে ওঠে যে সুরতরঙ্গ, কখনো প্রেম, কখনো জীবনই তার মূর্ছনা!
‘চণ্ডালিকা’ শব্দে পাঠকের মনে রবীন্দ্র অনুষঙ্গ আসবেই। নেপালি বৌদ্ধসাহিত্যে শার্দূলকর্ণাবদানের বিবরণ থেকে রবীন্দ্রনাথের যে ‘চণ্ডালিকা’ নাটকটির জন্ম, সেই শ্রাবস্তী নগরীর চণ্ডালিনী ‘প্রকৃতি’, নিজের জন্মপরিচয়ের ক্ষুদ্রতা তুচ্ছ করে, অতিক্রম করে খোঁজে তার মানব-পরিচয়। ‘চণ্ডালিকাগাছ’-এর বিভাব কবিতায় দেখি, কবিও লিখছেন,
“বোবা নরক
আবর্জনা
পেরিয়ে আলো
পৌঁছে যায়…
আমার লেখা
ফুঁপিয়ে ওঠে
কাঁদে
স্মরণযোগ্যতায়”
মুগ্ধতার এই ঘোর নিয়ে পাঠক যখন বইটি পড়া শুরু করে, কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে সে দেখে কবির আত্ম- উন্মোচন। জীবনসঙ্কটে ব্যাকুল কবি শ্বাসকষ্টের রাত ‘বোবা আয়নার চোখে’ যে কোনো আহত প্রেমিক সত্তা’কে মৃত দেখেন, কখনো অভিমানী স্বরে বলেন,
“…আমিও চাইনি, জীবনের কাছে কিছুই চাইনি…”, কিংবা বলেন,
“মৃত্যু ভয়, অস্তাচল সামলে রেখে আমি
তোমার কাছে
সন্ধ্যা দিতে আসি…”
এবং অবশেষে,
“কোথাও কেউ নেই,
এখানে একা একা
কাঁদেন ঈশ্বর”
কিন্তু নিয়তির বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠাই যে চণ্ডালিকার স্বভাব !
কবি তখন বলবেন :
“আগুন, আমি জন্মপিশাচ, তীব্র ক্রোধে ভেসে
নিজের মুন্ডু চিবিয়ে খাই, পুরোনো অভ্যেসে….
…আগুন আমি জন্ম পিশাচ, দেবীর কিছু জানি?
রহস্যময় পথের পাশে বিপদ টেনে আনি….”
অবলীলায় তিনি উচ্চারণ করেন, “…সর্বনাশ, তুমিই আমার প্রথম সহজ”,
ক্রোধের আগুনে অতঃপর জল ঢালেন নিজেই। তখন কী মেদুর, মায়াময় হয়ে যায় তাঁর কাব্যভাষা! যখন পড়ি,
“কখনো বলিনি তোমাকে আমার
উপত্যকার স্বপ্নপুরাণ, ধুপছায়াগাছ
বরং দূরের নরম শাখায় নাম লিখে যাই
গভীর জলের সতর্কতায়…”
অথবা,
“হাত ধরিনি, একা একাই মিশেছি নির্জনে
বিষাদ রঙা নদীটি সঙ্গেই”
কিংবা
“আমার বিরহ সহ্য, কিন্তু যদি পয়সার অভাবে
ছোট্ট মেয়ে চুপচাপ না খেয়ে ঘুমিয়ে থাকে, তাই
চায়ের দোকানে বসে মনে মনে কোকিল তাড়াই”
বলেন,
“জীবন পিতার মতো, মেয়েকেও ডেকে নিয়ে বলি
লড়ো কবিতা আমার, ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলে গিয়ে লড়ো…”
বিভাস রায়চৌধুরীর কবিতায় কোথাও জীবনকে অস্বীকার করা নেই। বহমান জীবনকে লিখে যান তিনি তাঁর জাদু কলমে। পাঠকই তাঁর ঈশ্বর। প্রকৃত পাঠকের কাছে তিনি পৌঁছেও যান, “অশ্রু চিনে চিনে”,… রবীন্দ্রজয়ন্তীতে… “মেঘলা তরুণীর কষ্টে কেনা কোনো লিটল ম্যাগাজিনে”
অথবা সে পাঠিকার কাছে,যার হাতে “বইপত্তর চুম্বনডাক শোনে”!
পাঠককে তিনি বলেন,
“স্পষ্ট বলব। কষ্ট বলব। হালকা বলব। ভারী।
পাঠক তোমার সামনে যেন নগ্ন হতে পারি”
Keats এর epitaph এ লেখা সেই বিখ্যাত পঙক্তি আমরা পড়েছি: “here lies one, whose name was writ in water”… আর আমাদের কবি তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘চণ্ডালিকাগাছ’ শেষ করেন তাঁর ‘এপিটাফ’ লিখে :
“বলিনি মৃত্যুর মতো সন্ধে বেলা হোক?
বাক্যের গভীরে
শুয়ে থাকব কিছুকাল
আমি
তুমি
আমার পাঠক”
……………………………………..
চণ্ডালিকাগাছ
আনন্দ পাবলিশার্স
যশোর রোডের গাছ আন্দোলনের গান
একটি সকাল... ‘লাজুক ভাতের দানা’
অমৃতাভ দে
প্রিয় কবি বিভাস রায়চৌধুরীর জন্মদিন আজ…
বাংলা নববর্ষে স্বস্তিকার কাছ থেকে পাওয়া প্রিয় উপহার… বইটি ‘কবিতা আশ্রম’ থেকে প্রকাশিত…বিভাস রায়চৌধুরীর ‘লাজুক ভাতের দানা’ পড়তে পড়তে মনে হল, ‘মন খারাপ করতে নেই…
দিগন্তে কখনও শেষ হয় না কবিতা… জীবন অপার…’
প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করছে খুব… বুঝতে পারি পথ আছে বলেই ছুটতে ছুটতে ঘাম মুছে আমি নিরাময়ের দিকে চলে যাই… ডুবে যাওয়া মানুষ শেষমেষ যেমনভাবে আঁকড়ে ধরে এক ফুলগাছ আমিও তেমনভাবে আঁকড়ে ধরি কবির শব্দকে… “একজীবন অপেক্ষার পর/ এইমাত্র বুঝি,/ লেখার আগে না লেখাকেই/ ধারণ করতে হয়…” কবিজীবন চাষির মতন… জীবন বাঁচে সম্ভাবনায়…ভালবাসছি বলেই শূন্যতাকে আকাশ মনে হয়, গাছকে মনে হয় বিভূতিভূষণ… কবির মতো আমারও বিশ্বাস— “ভালবাসা একটা নেশা/ ভালবাসলে চোখের জলকে মনে হবে সুজাতার পায়েস… ভালোবাসি বলেই তো তুমি ফিরে আসো আর না-আসো আমি মাটির প্রদীপ ঠোঁটে পরজন্মের পাশে দাঁড়িয়ে থাকি রোজ সন্ধেবেলা…”
ভালোবাসছি বলেই তো শূন্যতাকে আকাশ মনে হয় গাছকে মনে হয় বিভূতিভূষণ। তাঁর কবিতা আসলে আমার কাছে শ্লোক—ভালোবাসার ফসল, বেঁচে থাকার মন্ত্র। তিনি আমাদের জন্য বিছিয়ে দিয়েছেন আলপথ, দিয়েছেন জীবন্ত বীজতলা। তিনিই শিখিয়েছেন আমাদের কবিজীবন আসলে চাষির জীবন। লেখাই স্বয়ংক্রিয়। মাটির দাবি যে দৃঢ়।
বিধ্বস্ত অসুখের সময়কে কত কোমল ভেবে দেখেন তিনি। করোনার দিনগুলিকে কীভাবে দেখেন তিনি? সব ফেরত পাচ্ছি যেন— পুরনো দুঃখ, পুরনো আকাশ, পুরনো নদী। মানুষের পাপ মুছে পৃথিবীর সুস্থ হচ্ছে রোজ, আর তাইতো শান্তিনিকেতনে ফিরে আসেন রঙের রবীন্দ্রনাথ। অনেক ফুলের গন্ধে চিনে নেন কাকে? আমাদের সেই চেনা বন্যা লোহারকে। পাথর এবং অ্যাসিডকে নিয়ে অত সহজ কবিতা লেখেন তিনি, কিন্তু কত গভীর। তার সঙ্গে মিশে যায় মন্দির, মসজিদ, ভারত, পাকিস্তান, শরণার্থী, অনুপ্রবেশকারী। পাথর হয়ে ওঠে অযত্নে শুকিয়ে যাওয়া হৃদয়, চোখের জলই সাধনার অভাবে হয়ে যায় অ্যাসিড—
“চোখের জল আর হৃদয় সব ধর্মের ভগবান!
কেউ কারও চেয়ে বড় নয়…”
কবিতা জীবনমাত্র… যে বাঁচে, সে জানে কবিতা আসলে কিন্তু বেঁচে থাকার মতো ক্রমশ সহজ…
‘লাজুক ভাতের দানা’ সব ফেরত দিচ্ছে আমাকে… পুরনো দুঃখ, পুরনো আকাশ, পুরনো নদী… দেখতে পাচ্ছি মানুষের পাপ মুছে পৃথিবী সুস্থ হচ্ছে রোজ… সন্ধ্যাকে সাজাচ্ছে হাজার হাজার জোনাকি… পাশের জনকে ডাকি, তার কাঁধে হাত রেখে দিগন্ত যে অনেকদূর সেই কথাটা ভুলে যাই আমি… লাজুক ভাতের দানা শুশ্রূষা হয়ে ওঠে। কবিতা লেখার সময় আমিও বুঝতে পারি আমার মধ্যে একটা মেয়ে থাকে, যাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা আমার রোজকার কাজ। বিভাসদাই পারে এমন পঙক্তি লিখতে, এমন করে ভাবতে। আমার মেয়েও একটু একটু করে বড় হচ্ছে রোজ। আমার মনখারাপে সেও এক ভোর। দেশভাগ,উদ্বাস্তু কলোনি, সীমান্ত বিভাসদাকে আচ্ছন্ন করেছে বারবার।
“তাকিয়ে থাকে অনেক আকাশ জুড়ে
বোবার মতো… পুরনো অভ্যেস…
তুমি কি কিছু বলতে চেয়েছিলে?
দ্বিধার মতো দু’জন দুটি দেশ!”
ভাঙন শুধু ভাঙন ডেকে আনে। কবিতায় যন্ত্রণা প্রচ্ছন্ন থেকেছে, ছায়ার মত ঘিরে থেকেছে। কিন্তু তার সমস্ত জখম পৃথিবীর অতিরিক্ত গাছে ফুল হয়ে ফুটবেই। বুঝেছেন প্রয়োজন নেই কোনো ফুরিয়ে যাবার। মানুষই তো অন্যায়কারী। পথে পথে খুঁজে চলেন কী? কার সাথে দেখা হবে তার? আসলে আচমকা পথে পথে দেখা হয়ে যাবে—এই সম্ভাবনা চাই। তাঁর কবিতায় পয়লা মে হয়ে যায় এক বিশ্বাসের নাম। দেশহারা কলোনির মজদুর কমরেড বাবাকে আমারও বড্ড আপন মনে হয়। আগুনের আলোয় তাঁর চোখ চকচক করছে, স্বপ্ন খুঁজছে। আমিও বিড়বিড় করছি ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও!’উই শ্যাল ওভারকাম… বাংলা ভাষার দুঃখকে ছুঁয়ে বিভাসদা বেঁচে আছেন, তাই তো শ্রদ্ধা জানাতে ভোলেন না বাংলাভাষার কবি প্রবুদ্ধসুন্দর করকে। লেখেন—
“ব্যর্থ কবিতাও বাংলাভাষা
আঁকড়ে ধরে থাকে অধিকারে
আমাকেও সঙ্গে নাও, প্রবুদ্ধসুন্দর
কবি-নীল জম্পুই পাহাড়ে…”
তাঁর কবিতার ভাস্কর্য মুগ্ধ করে আমায়। পরম মমতায় তিনি সাজিয়ে তোলেন একের পর এক পঙ্ক্তি। কত সাবলীল তার গতি। কিছুটা অংশ পড়ার পর তিনি যেন একটু থামতে বলেন… বর্ণমালাকে ধারণ করি মননে… তারপর আবার চলি… কবিতার অনন্ত আশ্রমে। আজ তার জন্মদিনে লাজুক ভাতের দানা পড়তে পড়তে মনে পড়ছে কোনো এক শীতের রাতের কথা। হাওড়া স্টেশন থেকে ছেড়ে যাবে চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার। আমরা যাব বাঁকুড়া জেলার শুশুনিয়া পাহাড়ের কোলে… বাঁকুড়া কবিতা উৎসবে। প্লাটফর্মেই পরস্পর আড্ডায় মশগুল অনেকেই। আমার সঙ্গেও আলাপ হলো কয়েকজনের,তাদের লেখার সঙ্গে পরিচয় ছিল আগেই, সাক্ষাৎ হয় নি, আমি তো আপ্লুত।কথাকার,কবি, সাংবাদিক,শিল্পী,গায়ক— চাঁদের হাট ট্রেনের কামরা জুড়ে। আমি পাশে পেলাম কবি মৃদুল দাশগুপ্ত এবং কবি বিভাস রায়চৌধুরীকে। স্বপ্নের ট্রেনযাত্রা যেন। কলেজে পড়ার সময় প্রায়ই যেতাম কবি মৃদুল দাশগুপ্তের কাছে তাঁর পত্রিকাদপ্তরে বিধানসরণিতে। উঠে এলো কথোপকথনে সেসব কথা। কিন্তু বিভাসদার সাথে সেই প্রথম আলাপ। আচ্ছন্ন হয়ে পড়লাম। রাতের অন্ধকার ভেদ করে ছুটে চলেছে ট্রেন, মায়াবী আলোয় ট্রেনের কামরা জুড়ে কত না শব্দের কোলাজ, এগিয়ে দেওয়া নিজের বই- পত্রিকা। তারপর থেকে তাঁর কবিতাকে ভালোবেসে পৌঁছে যাই কবির কাব্যসংসারে। কোনো একদিন কবি আসেন কথার ঘরে। মনে হয়–আমাদের পুতুলগ্রামে পা রাখেন মাটির ঈশ্বর/ গাছ-পাখির পৃথিবী বানাতে শেখান/ কবিতার অক্ষর ভাত হয়ে ফুটে ওঠে কাঁসার থালায়…। তাঁর উপন্যাস ‘বাইশে শ্রাবণ’, ‘অশ্রুডানা’, ‘প্রিয় ইছামতী’ জীবনকে ছুঁয়ে-থাকা শব্দের নদী যেন। নিজের মুখোমুখি বসে থাকতে ইচ্ছে করে বহু ক্ষণ। ইতিহাস, সময়, ভালোবাসা, বেঁচেথাকা, ছিন্নমূল জীবন, নাটক, কবিতা বেঁধে বেঁধে রাখে। হাঁটতে থাকি আবার থামি, ছুটি। পালাতে চাই। ফিরে আসি জীবনের কাছে। তাঁর কবিতার বইগুলি আমাকে আশ্রয় দিয়েছে। আমার ব্যথা, আমার যন্ত্রণায়, আমার একাকীত্বে, আমার ভালোবাসায়, আমার দুঃখে-সুখে-কষ্টে-যন্ত্রণায় আমার সঙ্গী বিভাসদার প্রতিটি পঙ্ক্তি। আমি আগলে রাখি ‘চণ্ডালিকা গাছ’, আগলে রাখি ‘জীবনানন্দের মেয়ে’। সেই রাতের ট্রেন, হঠাৎ আলাপের মায়াময় মুহূর্ত আমাকে দিয়েছে কবিতার ক্ষেত…শব্দের বীজ… নিয়ে চলেছে মহাজীবনের পথে।
বিভাস একটি রাগের নাম
মধুসূদন দরিপা
বিভাস একটি রাগের নাম
সা ঋ গা পা দা র্সা
বিভাস একটি গাছের নাম
‘এক জীবন ধরে খুঁজেছি কত সেই গাছ !
দেশের বাড়ির বীজ …’
বীজ মানে গর্ভ, বীজ মানে দেশ
এ কোন উপমা নয়, জন্মবোধ
দেশ মানে সীমান্ত না, দেশ মানে গ্রাম
‘কবে আমি ঘুড়ির পিঠে লিখে রেখে দিয়েছি
সীমান্ত মানি না …’
কবে কবে সেই অন্ধকার যুগ থেকে
উড়িয়েছি ঘুড়ি
‘অন্ধকার মুখে নিয়ে দৌড়চ্ছি
যেন জন্ম জন্ম পার’
বিভাস একটি রাগের নাম
র্সা দা পা, গা পা দা পা, গা ঋ সা
বিভাস একটি কবির নাম
যে কবি বিশ্বাস করে
‘প্রতিটি মেয়ের নাম জলকাদা
প্রতিটি চিঠির নাম অন্ন’
যে কবি স্বপ্ন দ্যাখে
‘এ জীবন অবিরল জল কুড়নোর’
যে কবি স্লোগান দ্যায়
‘সমস্ত গাছের কাছে মানুষের ক্ষমা প্রয়োজন’
জলকাদা অন্ন মানে
অবিরল জল কুড়নোর দেশ
দেশ আদতে একটি গাছ
জন্মের গভীরে যার শেকড়
কে না জানে শেকড়ের গর্ভে থাকে বীজ
বীজ মানে মা
এ কোন উপমা নয়, জন্মবোধ
বিভাস একটি কবির নাম
যে কবি দিব্যি দ্যায়
‘তোমার শেকড় আমি মাথায় জড়ালাম’
যে কবি জীবনভর সহস্র শিরোনামে
একটিই কবিতা লিখে যান
বিভাস একটি রাগের নাম
দা পা, গা পা গা ঋ সা
পরম্পরার মেয়েটি
রুমা তপাদার
শূন্যাকাশে যুগের পর যুগ ধরে মহাকালচক্রপথে অসংখ্য তারাপুঞ্জ ঘুরছে অবিরাম একজন কবির মাথার ভিতরে শ্বাশত ক্ষতের মতো কবিতা আসে। কবিতা ঘোরে, ঘোর আসে, কবিতা হয়। পাঠক জানাতে পারেন কবিকে এইসব কিছু কবিতা হল না অন্যকিছু। আধুনিক যুগে মূল্যবোধগুলো পরিবর্তিত হয়ে গেছে, হয়ে যাচ্ছে। বিভাস সেই গভীর উপলব্ধিতে স্থিত হয়েছেন কালের বিহ্বলতা তাঁকে নাড়িয়ে দেয়, তাঁর মনে হয় দূরের ব্রীজ যেন আবছা হয়ে যাচ্ছে। প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই, দয়া মায়া নেই, স্নেহ নেই আছে প্রেম-প্রেম খেলা আর বিভিন্ন উপায়ে সাময়িক কিছু খ্যাতি জুটিয়ে নেওয়া। অথচ বিভাস স্পষ্ট বলে উঠতে পারেন,
‘রাক্ষুসে প্রেমের জন্যে আমি
চোখের জলের কাছে ঋণী’।
বলতে পারেন, ‘আজ শুধু ভালবাসা হোক’।
কবি সেই কষ্টের অনুভব থেকে ভাংচুরের ভবিষ্যৎ লিখে যান, লিখে যান কীভাবে পৃথিবী ফুরাচ্ছে প্রতিদিন।
‘আমার যখন কবিতা খাচ্ছে কাক
মন নিয়ে গেল এই দুনিয়ার চিলে
মনে পড়ে তুমি বড় রাস্তায় এসে
হাত ধরে কিছু দুঃখকে চেয়েছিলে’।
বিভাস নব্বইয়ের কবি। রোমান্টিক ভাবনা নিয়ে বর্তমানের যুগ-স্বরূপকে উদঘাটিত করা যায় না। উপমার আড়ালে মায়াবী প্রদেশের পথে চুপিচুপি হাঁটার থেকে তিনি স্পষ্ট করে উচ্চারণ করতে আগ্রহী। স্বর স্পষ্ট হলেও রহস্যময় আবরণ কিন্তু অটুট।
‘পাগল সময়, ধ্বংস ভাবিস? আমি ভাবি নৃত্যকে!
তাই লিখলাম মাত্রাবৃত্তে অক্ষরবৃত্তকে…’
আধুনিক বাংলা কবিতার সামগ্রিক নির্মাণের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এইজন্য কবিতার সামগ্রিক নির্মাণশৈলী অনুধাবনের প্রয়োজন।
বইয়ের সূচিপত্রতেই তিনি তিনটি ভাগে কবিতাগুলিকে বিভক্ত করেছেন। প্রথমের ৩২ পাতা পর্যন্ত ‘স্বভাবকবি’। পরের দুটি ভাগ ‘পূর্বজন্ম’ ও ‘মা-বাবা অপেরা’।
‘পূর্বজন্ম’-তে আছে একটি প্রবেশক বাদ দিয়ে দশটি কবিতা। এ দশটি কবিতা একটি পরম্পরা অনুযায়ী সাজানো। কবি এখানে কবিতা-পরম্পরাকে নিয়ে কাজ করেছেন। নৈবেদ্য-র পরের কবিতা ‘যেতে পারি কিন্তু কেন যাব’ শক্তি, বিনয়ের ‘ফিরে এসো চাকা’ তারপর একে একে সুনীলের ‘নীরা, হারিয়ে যেও না’, শঙ্খ ঘোষের ‘ছন্দের ভিতরে এত অন্ধকার’, অলোকরঞ্জন, উৎপলকুমার বসু, ‘ব্যান্ডমাস্টার’ তুষার রায়, ‘শীতকাল কবে আসবে, সুপর্ণা’ ভাস্কর চক্রবর্তী, ‘সূর্য পোড়া ছাই’ জয় গোস্বামী হয়ে ‘গোপনে হিংসার কথা বলি’ মৃদুল দাশগুপ্ত পর্যন্ত।
এর পরের সাবটাইটেল ‘মা-বাবা-অপেরা’। প্রথম কবিতা ‘গঙ্গা-পদ্মা’য় তিনি লিখছেন, ‘এমন মজার ছিল মা-বাবার বৃষ্টি সেই রাতে / কখন ঘুমিয়ে গেছি দুই ভাই গঙ্গা-পদ্মা/ মা-বাবার খাটের তলাতে।’
শব্দ প্রয়োগের বৈশিষ্ট্যগুলি প্রথমে আলোচনা করা প্রয়োজন। বিভাস-এর রচনায় শব্দ প্রয়োগের নানা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। বিশেষ করে ক্রিয়াপদের প্রয়োগ তার অন্যতম। শব্দ বিচারের সঙ্গে কবিতার ভাষা প্রয়োগের বৈশিষ্ট্যও অনুধাবনযোগ্য। এবং ভাষার সঙ্গে ভাবের অনুষঙ্গে বিশেষভাবে লক্ষণীয়,
“মা, তুমি ‘অ’ পড়ছ, আর ‘আ’ পড়ছ… আকাশে
দৈববাণী—
এই কবিতার শিরোনাম ‘ব্যর্থ কবির চিঠি, মা-কে’। এই বইটির প্রতিটি কবিতার নামকরণ অসামান্য। কবিতার সামগ্রিক নির্মাণের সঙ্গে নামকরণের সম্পর্ক স্পষ্ট।
বিভাসের কবিতায় উপমাগুলি অনন্য। উপমা হল শব্দবিন্যাস দ্বারা দুটি বিষয়-বস্তুর মধ্যে সাদৃশ্যমূলক একটি তুলনা করা। সেই তুলনার মধ্য দিয়ে কাব্যের উপভোগ্যতা বাড়ানো। প্রচলিত চিত্রকল্পবাদ দিয়ে তিনি সরাসরি লিখতে পারেন তাঁর কবিতায়। ‘জীবনান্দের মেয়ে’কবিতায় তিনি লিখছেন
‘বাবার কবিতা থেকে নেমে
কলকাতার আঁকাবাঁকা গলিতে গলিতে ঘুরে বেড়ানো আমার জল হাওয়া
ময়লা, ছেঁড়া আমি পাগলী মেয়ে
কোনদিন তরুণ কবিরা
আমাকে ভেবেছ কেউ?
জীবনানন্দের এই কখনও না-ছাপা কবিতাকে?’
ইতিহাস তাঁর হাত ধরে কবিতায় আসে যেমন তেমনই আছে একইসঙ্গে সমসাময়িকতাও। আবহমান কালের সঙ্গে তিনি বহমান কাল ধারাকে সমসূত্রে গেঁথে দিতে পেরেছেন। তাঁর কবিতায় সময় কোনও বিচ্ছিন্ন কালখণ্ড নয়, প্রবাহমান এক ধারা। সেই ধারায় লীন হয়ে যায় অতীত বর্তমান সবকিছু। ‘বাঙালের ছেলে’ কবিতায় লিখছেন,
‘লখাই ভেসেছে সঙ্গী বেহুলা… পূর্বদেশের জলের সুর
মাসি পিসিদের গ্রাম ভেসে যায় সুর নিয়ে যায় অনেক দূর
অনেক দূরের খুলনা শহর যশোর জেলার চোখের জল
এপারের বুকে মেঘ হয়ে গেছে গোবি সাহারার যা সম্বল’
পৌরাণিক সাহিত্যের বেহুলা-লখীন্দর প্রসঙ্গের পরের পঙক্তিতে তিনি লিখছেন সমসাময়িকতার কথা
‘লড়ে গেছি, ভালো খেতেও পায়নি, ভালো জামা… নেই শুকনো মুখ…’
এর পরের লাইন ইতিহাসের কথা
‘স্বপ্নে পেলেই বাহান্নকে ভিজিয়ে দিয়েছে রক্তে বুক’
এবং তাঁর কবিতায় ঐতিহাসিক ভৌগলিক ও পুরাণ-প্রসঙ্গ ছাড়াও সমকালীন যন্ত্রণার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ স্পষ্ট
‘রাস্ট্র, তোমার অনেক পুলিশ?
আমার শব্দ। শব্দ আনি!
বাঙালের ছেলে কবিতা লিখছি, এটাই আমার চোখরাঙানি’
আশা-নিরাশার দ্বন্দ্বে কবিমন দোলায়িত। কখনও মনে করেন প্রেম-শিশু-গৃহ-অর্থ-প্রীতি-যশ সব এক কথা নয়, যন্ত্রণার কথা লিখতে গিয়ে তিনি জ্যোৎস্নাকে ‘পাগলা’ বলেন, কারণ তিনি স্বীকার করে নিতে পারেন,
‘কী সাহস বাংলা কবিতার’।
‘সমস্ত দুঃখীকে আজ’: ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার
মুস্তাক মুর্শেদ
বাংলা কবিতায় পাঠকের চেয়ে কবির সংখ্যা বেশি-এমন একটা কথা চালু আছে যাতে মিশে আছে ঠাট্টা। কবিতার কেন্দ্রে থাকা পাঠকের স্বতন্ত্র স্বর চিনে নিতে অসুবিধা হয় না। হাজার ভিড়ের মাঝেও তাদের ঠিক চেনা যায়।বাংলা কবিতায় বিভাস রায়চৌধুরী হলেন সেই স্বতন্ত্র এবং বলিষ্ঠ স্বরের অধিকারীদের মধ্যে অন্যতম একজন।কবি প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত এক জায়গায় বলছেন, “কোনো কবি যদি একই বিষয় সারাজীবন পুনরুক্তি করেন, তাঁর যদি কোনো উত্তরণ না হয়, তা যেমন দূষণীয়, আবার কবি যদি চরিত্রবান না হন, তাঁর যদি কোনো নিজস্ব পৃথিবী তৈরি না হয়ে ওঠে, তাঁর গলার স্বর যদি সহজেই না চেনা যায়, তা-ও একইভাবে সমালোচনার যোগ্য।” এই কথার পরিপ্রেক্ষিতেই যেন ‘সমস্ত দুঃখিকে আজ’ কাব্যগ্রন্থের ‘জননী’ নামক কবিতায় বিভাস রায়চৌধুরীর অকপট স্বীকারোক্তি:
“মানুষের একান্ত ভেতরে
আছে যে নানান স্বর
তারই কিছু ছিটকে আসা ধ্বনি
সহ্য করো,
আমার জননী।
যা কিছু লিখেছি, সব
অবাক নির্জন থেকে
মহামায়া ধারাবিবরণী…”
বিভাসদার কবিতার মূল্যায়ন করার স্পর্ধা আমার নেই তবে যেটুকু বুঝেছি, তাঁর সংগ্রামী জীবন, হৃদয়গাহী উপলব্ধি ফুটে ওঠে তাঁর কবিতার অক্ষরে। দুনিয়ার সমস্ত মেহনতি, দুঃখী মানুষের মুখপাত্র হয়ে অস্ত্র হিসেবে তিনি তুলে নেন অক্ষরকে। ‘সমস্ত দুঃখীকে আজ’ কাব্যগ্রন্থ যেন সভ্যতার চিরন্তনী গান, যেখানে তিনি পরতে পরতে তুলে ধরেছেন প্রান্তিক, অভুক্ত, ছিন্নমূল মানুষের হাহাকার, তাঁদের কতশত অপ্রকাশিত যন্ত্রণার কথা—
‘আমি ভাবি জয় হোক
ক্ষুধার্তের জয় হোক
মাটি কেটে ফেরে বাবা…কলোনির বাড়ি
লঙ্কাগাছে জল দেয় রুগ্ন, রাগী মা
এসব তুলনা আমি মেঘে মেঘে লিখি
এসব তুলনা আমি শিশুদের বলি
মা-বাবার সমস্ত ঝগড়া
মনে রাখি…আমি প্রচারক
রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র, আমি তার বিধান-ঘাতক।’
গুস্তাভ প্লবেয়র বলেন—‘writing is a dog’s life, but the only life worth living.’ আসলে কবিতা কবিকে লিখিয়ে নেয়, বাধ্য করে তাঁর জীবনবোধের প্রকাশ ঘটাতে।
দুঃখী মানুষের কথা লিখতে লিখতে তিনি যখন তাদেরই একজন হয়ে যান, তিনি বুঝতে পারেন সে সব কথন হয়তো বা তাঁর জন্য ঝুঁকির মতো, সাপের মতো ফণা তুলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সস্তা জনপ্রিয়তার ভয়ও তাঁকে পেয়ে বসে,তাঁর সীমানা তাঁকে সতর্ক করে, তিনি ফিরে যেতে চান অপেক্ষারত তাঁর আপনজনের কাছে—
“…খুব সন্দেহ হয়, আর খুব লোভ হয়…
আর লোকের মুখে মুখে ঘুরবার শ্রম হয়…
বাপরে! আজ অন্য কবিতা নিয়ে ভাবব,
কিছুতেই ফনাটি নিয়ে নয়,
মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে নয়,
লেখার পাতা থেকে উঠে আজ সেই পথে যাওয়ার কথা
যে পথের বাঁকে আমার দেরি হচ্ছে দেখে
এক কালো মেয়ে খুব দুশ্চিন্তায় রয়েছে…”
পরমুহূর্তেই নিঃসংশয়ে লেখেন-
“অত কী ভাবার আছে? দুঃখটুকু থাক
শোকের নিভৃতি এসে আমাকে সাজাক”
এইসব ছোটছোট দুঃখ কথার ফুল দিয়ে মালা গাঁথার পরেই তিনি জানিয়ে দেন—
“কথা দিয়ে লিখে গেছি ফুল
কথা দিয়ে কুড়িয়ে নিয়েছ?
……….দুঃখিত মৃত্যুর মতে, জন্ম এক মৃদু অন্ধকার…”
লেখার সঙ্গে তাঁর ব্যক্তি জীবনের একাত্মতা একাকার হয়ে যায় ‘জ্বর’ কবিতায়, যখন তিনি লেখেন—
“যা দেখেছি বলবার নয়
গুমরে মারে জ্ঞান
জ্বর আসে, জ্বর ফিরে যায়
লালামাখা পড়ে আছি
যত শব, তত উৎসব
আমার বাংলায়”
যদিও শেলী সেই কবেই বলে গেছেন-
‘Our sweetest songs are those that tell of saddest thought’
তবু যে কোনো হাহাকারকেই নিশ্চয় কবিতা বলা চলে না,
তার মধ্যে যদি মাধুর্য না থাকে, মনকে স্পর্শ করার উপাদান না থাকে। বলার অপেক্ষা রাখে না বিভাসদার কবিতার দুঃখী মানুষের আর্তি মাধুর্য নিয়ে খুব সহজেই পাঠকের মনের গহীনে স্পর্শ করে। আমার পড়াশোনা যদিও খুব কম তবু বলতে পারি বাংলা কবিতায় আমরা বহুদিন এরকম স্বর শুনিনি যা আমাদের এরকম আচ্ছন্ন করে রাখতে পারে—
“জলে ভেসে ঘর
মৃত নদী দু’কূল ছাপিয়ে
কলোনি ডোবায়
মাথায় সংসার রেখে জল ভাঙে বাবা
মা’র খেতে খেতে
ডুবে-ভেসে আমি যাই দয়ার তাঁবুতে…
………………………………………………….
আলে আলে কেউটের দল
কতদিন দেখেনি যে মেঘের সজল
আমিও দেখিনি ভারতের রাষ্ট্রপতি কোনওদিন!
আমাকে নেয়নি কেউ…পার্লামেন্টে কারা যায়,
ঝগড়া করে অত?
গরিবের দুঃখে কান্না মুছে নেয় সুগন্ধি রুমালে?
.………….….………………………………….
রাজাদের বাড়ি যায়, ওরা তো দালাল!
দালালের মুখ আমি দেখিয়াছি ভোটের সভায়
হাত নাড়ে, চিৎকার করে বলে, ‘ভাইসব…
এ লড়াই বাঁচার লড়াই!’
কে কাকে বাঁচায়?
..….………………………………………………
আমি তো বাজার নই
বাজারেরও আমি নই কেউ
হল্লা আসে , হল্লা ফিরে যাই,
খিদে ও বিষাদে বাঁচে শত শত পোকা,
বিনষ্ট সন্ধ্যায় যারা
আগুনে ঝাঁপায়
..…………………………………………………..
হাত পাতলেই জেনো ভিখিরির মতো লাগে!
ভিখিরির চোখে আমি
কিভাবে তাকাব, বুনো চাঁদ?
যে যার অশ্রুর জোরে ঘুরে দাঁড়ানোই প্রতিবাদ….”
পঙ্ক্তির পর পঙ্ক্তি এভাবেই ঘোর লাগায়, জীবনের কঠিন থেকে তুলে আনা উপলব্ধি দিয়ে দুনিয়ার সব দুঃখী মানুষদের তাঁর কবিতার ছাতায় আশ্রয় দেন, তাঁদের স্বপ্নকে জিইয়ে রাখেন।ঋষির মতোই সেই সত্যদ্রষ্টা কবি বলে ওঠেন—
“চাবুক, তোমার কাছে
কান্না জমা রেখে যাচ্ছি রোজ…
চাবুক, একদিন আসবে
শব্দ হবে ফেরারি নিখোঁজ…
আমি জানি সেইদিন
ডাল-ভাত একটুকরো মাছ
পাতে এসে জড়ো হবে…”
…………………………………….
“একটা কিছু না কিছু হবেই
কোনও স্বপ্ন সফল হয় নাকি
কোনও স্বপ্ন ব্যর্থও হয় না
ঘাসের ওপর পড়ে আছে দুঃখী পৃথিবীর কিছু জল
দু চোখে শুষে নিলাম প্রাণপণ
এইবার ঘুরে দাঁড়াবো”
আজ সেই কবির জন্মদিন। আজকের দিনে শুধু একটিই প্রার্থনা—
ভালো থাকুন দুঃখীদের মুখপাত্র। আপনার কলম যেন চাবুক হয়ে এভাবেই সপাটে গর্জে উঠুক রাষ্ট্রযন্ত্র তথা
সমস্ত শোষণযন্ত্রের বিরুদ্ধে। আমার প্রণতি গ্রহণ করুন।
অনেক অনেক ভালবাসা আপনার জন্য।
“নষ্ট প্রজন্মের ভাসান”— অশ্রুর নির্জনতা
সুকৃতি
শুভ জন্মদিন বিভাসদা। অনেক অনেক শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানাই। আসলে এসব এক ভালবাসার কবি, ভালবাসার মধ্যে ফুলে থাকা কবিকে ভালবাসার ভাষা।
বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে অশ্রুকে আড়াল করার অছিলায় দুঃখ কষ্ট অভিমানও কবিতা হয়ে উঠেছে কলমে তার।
কবির প্রথম কাব্যগ্রন্থ “নষ্ট প্রজন্মের ভাসান” নিয়ে দু-চার কথা বলি। ‘কবি’দের প্রথম কাব্যগ্রন্থে লহুর রঞ্জকের সাথে স্বেদের প্রাবল্য থাকে বেশি। থাকে অশ্রুর নির্জনতা। পাঠককে কেবল ঘ্রাণেন্দ্রীয়কে তীব্র করে সেই সব পড়ে নিতে হবে।
আলো আছে মানে অন্ধকার যেরকম আছে, জল আছে মানে আগুনও থাকবে। এই হল বৈপরীত্য ধারার এক পরিপূর্ণ রূপ। তাই জলের সংজ্ঞায় ভেসে যাওয়া শরীরের থেকে একটি বিচ্ছিন্ন হাড় পুবের চুল্লির থেকে দূরে…। দূরে হলেও আছে তো। একটি চলমান কবিতা কেবল ওই হাড়টিকে জলের সংজ্ঞায় পুবের চুল্লির দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। অনন্ত গমন তার।
গাছেরা প্রকৃত কবি এই কথা এক বৃক্ষনাথের কবিতায় পাওয়া যায়। যেখানে কবির “শবদেহ ছুঁয়ে/ একটি বৃক্ষের শেকড় মৃত্যুর বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ হয়ে ওঠে।” কবির চোখে তাই মৃত্যুর পর দেখা যায় “একটি বৃক্ষের ও কবির/ জন্মান্তরের ইতিহাস এক।”
“ভুমিক্ষয়” নামে একটি কবিতা অদ্ভুত ভাবে শুরু হয়, “মূলরোম বার্তা পাঠিয়েছে— পাতাল বিপন্ন, এখন অন্যত্র সন্ধানে/ নামতে হবে।” কত সাধারণ একটা কথা বোধের উচ্চতা ও দেখার গুণে কোথায় উত্তীর্ণ হয়! উপদর্শনে তো বলেইছে দেখার চোখই বড় কথা।
‘অন্ধের বিদ্যুৎরেখা’— বিভাস রায়চৌধুরী
বঙ্কিম লেট
পাঠ-জাত পূর্বরাগের পর, কবি বিভাস রায়চৌধুরীর সঙ্গে আমার প্রথম দেখা শান্তিনিকেতনে, ২০১৭ সালে। কনকচাঁপা গাছের ছায়ায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সান্ধ্যকালীন টিফিন সারছিলেন। পা ছোঁয়ার জন্যে ঝুঁকেছি, উনি বললেন—“পায়ে হাত দিয়ো না, নোংরা লেগে আছে!” বাটা কোম্পানির স্যান্ডেলের ফিতেয় পরিভ্রমণের সামান্য ধুলো ছাড়া সমগ্র পা দুটি ধবধবে, অমলিন।
আমি অবাক হইনি, শিহরিত হয়েছিলাম: এতদিন ওঁকে পড়ে ওঁর সমন্ধে একটা আবছা অনুমান হয়েছিল—যা আছে তাকে রহস্যাবৃত করা, যা নেই তাকে ইশারায় দেখিয়ে দেওয়া ওঁর স্বভাবসিদ্ধ, এবং ওঁর জীবনযাপন এবং কবিতার মধ্যে সীমারেখা প্রায় থাকবে না, ওঁর জীবনই কবিতা কিংবা কবিতাই জীবন—এই অনুমান সুনিশ্চিত হল, প্রথম দেখায়। যিনি কবির মতন বাঁচেন তাঁর সামান্য কথাও বহুমাত্রিক দোলা লাগাবে।
গাছে যেভাবে পাতা আসে, বিভাসদার মধ্যে কবিতা সেভাবেই আসে; এটা আমি অজস্রবার অনুভব করেছি, পরবর্তীকালে ওঁর সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোয়।তার মধ্যে আপাতত একটা বলি—পুরুলিয়ার শালপলাশের জঙ্গলে শোনকুপির কটেজে আগুনরাঙা পলাশ ফুলের মাথায় চাঁদ উঠেছে। আমাদের মধ্যে কেউ একজন বলল—“আহ, কী সুন্দর চাঁদ!” বিভাসদা সঙ্গে সঙ্গে বললেন—“চাঁদ এত সুন্দর কেন বলো তো?” আমরা চুপচাপ। উনি বললেন—“ মিথ্যে বলে!” এই আপাত নিরীহ কথাটির ব্যাপ্তি একবার ভাবুন। সূর্য সত্য বলে তার তেজ আমাদের ঝলসে দেয়। উনি বানিয়ে কিছু লেখেন না, ওঁর খুব কাছে আসার সৌভাগ্যবশত আমি ব্যক্তিগতভাবে স্পষ্টভাবে অনুভব করেছি। মহাজগতের এক ক্ষুদ্র খণ্ড হিসেবে ওঁর আত্মার প্রাকৃত আলোড়নগুলিকেই ধরে রাখেন, লিপিবদ্ধ করেন সাদা কাগজে। মহাজাগতিক সত্যকে উনি তেড়েফুঁড়ে স্পর্শ করেন না, স্পর্শ করেন প্রেমিকের মতো, অথবা প্রতিটি বস্তু, অনুভব যে যেমনভাবে আছে তাকে সেভাবেই থাকতে দেন, সন্তের মতো। এই জন্যেই পাতা উচ্চারণ করলে পাতার গন্ধ ওঠে, মাটি বললে মাটির গন্ধ ওঠে। উনি কবিতা লেখেন না, কবিতা যাপন করেন।
ওঁর ‘বীজধান সংগ্রহ’ কাব্যগ্রন্থটির কথাই ধরুন। এ-ও তো আত্মার ইতিহাস-ই, একক কিংবা অসীম আত্মার যবনিকা উন্মোচন। ভাত, ডাল, রুটির মতোই, কবিতা দিয়ে বেঁচে থাকবার আয়োজন, চরমতম সত্যকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখবার আয়োজন। “ কী এমন বাকি থাকল পাওয়া,/ যখন দুঃখীকে সর্বোচ্চ শৃঙ্গের মতো লাগে”। দুঃখই যে জগতের সার, দুঃখই শাশ্বত; টাইগার হিলে যিনি সূর্যাস্তের সুষমা দেখেছেন তার কাছে সব প্রাপ্তিই তুচ্ছ, কেননা তিনি জানেন—“যত পাও, একই সঙ্গে/ ততটা হারাও—/ সমপরিমাণ নিঃস্বতা প্রতিটি প্রয়াসে”। তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী তা-ই হয়।
“শূন্যতা সম্পর্কে/ আমার ধারণা এই—/ হাতের মুঠোয় তুমি, তবু/ ঘিলুর ভেতর ওই একটা আকাশ/ ফুরোচ্ছে না কিছুতেই”। শূন্যতার প্রতীকী শব্দ ‘আকাশ’ শূন্যতাটাকে সঙ্গে সঙ্গে সদর্থক করে তোলে। বিভাসদা শূন্যের পুজারি, শূন্যতা তাঁকে ভাঙে না, সমাহিত করে, পরিপূর্ণ করে। ওঁর শূন্যতা নেগেটিভ স্পেস নয়, বরং পজিটিভ স্পেস। মুলে পৌঁছাবার পরিসর। জাপানি দর্শনের ‘মা’-এর মতো মূল্যবান।সবকিছু ভরাট হলে সূর্যালোক ঢুকবে কোন দিকে?
অল্পই কবি বিভাসের কাছে ঢের—“সে কেবল অল্প আলোতেই/ আরও অল্প হয়ে/ বেঁচে / থাকতে চাই কিছুটা আবারও…”। ঠিক “বলবার মতো পাখি যেমন অবাকের জলপান সারে/ পাতার আড়ালে”। পাখিরা সেদিনের তণ্ডুলটুকু ছাড়া বেশি চায় না বলে, খোলা আছে আকাশ।
‘অন্ধের বিদ্যুৎরেখা/ একটি জীবন/ আকাশে কখন দেখা দেয়”। এইখানে বিভাসের শিল্প চেতনা, জীবন চেতনা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। চেতনা নাশ না করলে চৈতন্য হয় না, মাথার কাঁটা দিয়ে অহং-এর চোখ দুটিকে নষ্ট না করলে প্রকৃত সত্যকে উপলব্ধি করা যায় না, শিল্পেও চেতন ছাড়িয়ে অবচেতন অভিমুখী না হলে সত্য এবং হৃদয় থেকে শত যোজন দূর, তাই বর্ষা বাদল ঝড় ঝঞ্ঝার অপেক্ষায় থাকেন কবি বিভাস।
এইভাবে সৃষ্টির মূল বীজগুলি, জগৎ-সংসারের সারোৎসারকে তিনি সংগ্রহ করে রেখেছেন তাঁর ‘বীজধান সংগ্রহ’ কবিতার বইটিতে;ঠিক যেভাবে তিনি কথা বলেন,চা খান, চলন্ত ট্রেনে পেইন্টিং অ্যাপে ছবি আঁকেন, আর হঠাৎ হঠাৎ ধুন্ধুমার ইঙ্গিত রহস্য, অনিশ্চয়তা এবং শিহরণে মাতিয়ে রাখেন, সেইভাবে। উদাসীন যুবকের মতো তাঁকে এক ঝলক দেখে পেরিয়ে গেলে ভাল, চোখে চোখ রাখলেই বিপদ, মীনের মতো গেঁথে যাবে; যেমন আজ সারাদিন ফের আমি গেঁথে গেছি ওঁর প্রতিটি মায়াবন বিহারিণী কবিতায়। বেশি নয় কিছুটা সময় দাবী করে বিভাসদার কবিতা।
শুভ জন্মদিন, বিভাসদা। ভাল থাকবেন। প্রণাম। জগত ভ্রমণের ধুলোটুকুই আমার বীজধান সংগ্রহ, ওটা চাই।
প্রকৃতির কাছে ক্ষমা চেয়েছেন কবি...
“প্রেম একরকম শূন্যতা! মহা-মহা-মহাকাশ লেগে আছে দেহে”
সঞ্চিতা দত্ত
যিনি প্রেমটাকে কেবল নারী পুরুষে আবদ্ধ রাখেননি। যিনি প্রেমকে এক থেকে অনন্তে নিয়ে গেছেন। প্রকৃতির মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছেন সবসময়। কেবল কবিতা নয়, যার গদ্য, অভিনয় আমি ভালবাসি। সবথেকে বড় কথা মানুষ বিভাস কাকু আমার খুব প্রিয়। জন্মদিনে সমস্ত ভালথাকা দিলাম।
“প্রেম একরকম শূন্যতা!
মহা-মহা-মহাকাশ লেগে আছে দেহে
মানুষ ঝাঁপায়… তবু
আকাশ পর্যন্ত এসে মুছে যায় সব নর-নারী।
কারো জন্য কান্না এলে
আমরা শুধু চুপচাপ সেটুকুই পারি।”
প্রেম—যা প্রতি মুহূর্তে আমাদের নিঃস্ব করে। প্রতিটি মানুষই প্রেমের অন্বেষণ করে। কিন্তু প্রেম ধরা দিয়েও দেয় না। প্রেম আসলেই শূন্যতা। তার নিজস্বতা নিয়ে অন্দরমহল সাজিয়ে সে থাকে নিজের মতো। একদিকে তার সাজানো সদর, আর অন্যদিকে লোকচক্ষুর আড়ালে এক দিব্য আলোর ইশারা। যে আলো প্রেম থেকে শুদ্ধ চেতনার বোধের জন্ম দেয়। প্রেমিক কবি যখন বলেন “কারো জন্য কান্না এলে…” এখানে ‘কারো’ শব্দটির প্রয়োগে কেবল নরনারী প্রেমে আবদ্ধ থাকে না। বুঝতে বাকি থাকে না এই প্রেম বিশ্বের সমগ্র স্তরে বিলীন; যেখানে একটা ছোট্ট ঘাসফুল থেকে অন্তরঙ্গ প্রেমিকা জড়িয়ে আছে একত্রে। এই স্নিগ্ধতার ছোঁয়া বারংবার আমরা প্রেম কাব্যগ্রন্থে পাই।
অন্য একটি কবিতায় কবি বলেন ‘বিশ্বাস অপেক্ষা প্রিয়…’। এক বিশ্বাসের উপর ভরসা করে চোখ বুঝে হেঁটে যাওয়া যায় মাইলের পর মাইল। আমরা গাছ লাগাই। বিশ্বাস রাখি গাছের উপর। ফল হবে,ফুল হবে। কিন্তু প্রয়োজন অপেক্ষা। এ বিশ্বাস যেন জন্ম জন্মান্তরের মহাকালের। কবি বিশ্বাস রাখেন এই বিশ্ব প্রকৃতির সবুজে। সমগ্র দেশ সমাজের গ্লানি উপেক্ষা করে সবুজ হবেই পৃথিবী। ভাবতে ভাবতে কবি নিজেই গাছ হয়ে ওঠেন ক্রমশ। বলে ওঠেন—”গাছ বলে ডাকো আর শিকড় অবধি ওঠে কেঁপে”। এই অনুভুতির সাথে আরও নিবিড় ভাবে যোগ দেয় মন। ক্রমে মন অনুভূতিকে ছাপিয়ে ওঠে। আরও তীব্র হয় প্রেম। ভালবাসা হয়ে যায় গাছ। শুদ্ধ হয় সময়। বলে ভালবাসো, আরো ভালবাসো। প্রেমকে যেমন কবি দিয়েছেন গাছ প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, প্রেম কবিকে দিয়েছে সময় চেতনার গাঢ় উপলব্ধি। কবি জানেন ভালবাসলে মানুষ গাছ হয়ে ওঠে। তীব্র অসঙ্গতির ভেতর খুঁজে পেয়েছেন সংগতিপূর্ণ দিব্য জীবনের আলোর স্পষ্ট পথ। ক্ষয়ে যাওয়া সম্পর্ককে বাঁচাবার আশায় কবি ধ্বংস হননি। অবক্ষয় ও ধ্বংসের মাঝে কবি বেদনাহত হয়ে আশ্রয় চেয়েছেন গাছের কাছে। প্রেমের অস্তিত্ব স্বরূপ লিখেছেন— “তুমি এসে দেখে যাবে/ তেমন আশায়,/ কাটা ডালে নতুন পাতাকে/ রেখে যেতে হয়…রোজ রেখে যেতে হয়।”
আলোছায়ার অনুভবের মধ্য দিয়ে চিরায়িত আনন্দের দিকে কবি মন ছুটে যায়। কবির ‘আমি’ প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য ‘আমি’তে পরিণত হয়। আলোকিত হয় ‘আমি’। আর বিশ্বাস শব্দের প্রতি ভালবাসায় প্রতিটি মানুষ ও প্রকৃতিকে কবি বিশ্বাস করতে ভালবাসেন। মুগ্ধ বিস্ময়ে আলোর জোছনা ও অন্ধকারের দোলাচলের ভেতর দিয়ে জীবনবোধে পৌঁছাতে যে প্রশান্তি তার আশ্রয় বিশ্বাস। দ্বান্দ্বিক চেতনা ত্যাগ করে লেখেন—“আলোর ভেতর থাকে/ একলা দুটি গাছ…/ কান্না ভেজা আলো/ আমার বিশ্বাস।”
প্রকৃতির নিগূ়ঢ় সৌন্দর্যের প্রতি আকণ্ঠ পিপাসা ও প্রেম চেতনার রূপ তুলে ধরেছেন কবিতায়। যে কবিতা অলস সকালে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে পাঠ করার মতো নয়। এ জাগ্রত জীবনবোধের কবিতা।যে বোধ থেকে নতুন প্রেমের জন্ম হয়। শেখায় প্রেমবোধ। প্রেমের সহজ পাঠ। কবি মানস সহজ হতে শেখায়। স্বপ্ন-শান্তি-ভালবাসা-ঘর বাঁধা তুচ্ছ হয়ে যায়। অনন্ত নীল আকাশের দিকে তাকিয়ে বলতে ইচ্ছে কর—“আকাশে অনন্ত এল/মাটিতে চুম্বন রাখলাম”।
কবি বিভাস রায়চৌধুরী গ্রাম ভালবাসেন। ভালবাসেন প্রকৃতির গন্ধ। জানতে চান প্রতিটি ছোট ছোট অযত্নে পড়ে থাকা গাছ পাতা লতার খোঁজ। জানাতেও চান। যে সময় সকল বাঙালি কবির মনে প্রেম মানেই কাম-বেদনা-হতাশা। কবি এসব কিছুর মাঝে খুঁজতে চেয়েছেন উত্তরণের পথ। তার কবিতায় অবচেতন থেকে চেতনার জগৎ খুলে যায়।
প্রেম অর্থে কখনো দেশ কখনো-বা নদীর সাথে তুলনায় কবি বলেছেন—“সীমান্তে কখনো কোনো/ দেশ নেই/ শুধু দুটি দেশ দেখা যায়…/ আমিও সম্পর্কে আজ একটি সীমান্ত…”। দুই দেশকে সম্পর্ক ধরে নিয়ে নিজেকে মধ্যবর্তী সীমান্ত মনে করা কবি এখন পুরনো প্রেমের কাছে সততা ধরে রাখা ও প্রেমকে বয়ে যাওয়া নদীর জলের সাথে তুলনা করছেন—“সে জল হারিয়ে গেছে/ ফেলে গেছে শুধু গতিপথ/ প্রতিটি পুরনো প্রেম/ গোপন কথা মতো সৎ…”
‘প্রেম’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতায় কবি কোনও এক ‘তুই’কে ডেকেছেন। কবিতা পাঠ করলে বোঝা যায় যে তুই কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তি নয় যে সমগ্র পাঠক।জীবনের রূপ ও রঙের সাথে অনেক জীবন অভিজ্ঞতায় উঠে আসা ‘তুই’। কবি জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে কালক্রমে উঠে আসা ‘তুই’কে বলেছেন কবি। যে ‘তুই’ কবিকে ভালবাসে, ভালবেসেছিল, ভালবাসবে। যে ‘তুই’ এক থেকে সমগ্র পরিনত হবে। তার জন্যই কবির এই প্রেম। “কবিতার মায়া রাখি/ রাখি কিছু বিষ/ তুই এসে পড়ে পড়ে/ নিঃস্ব করে দিস।” কবি মনে করেন— “ভালবাসা হল দুই শূন্যের মিলন”। বাস্তবেই তাই। শূন্য না হলে ভালবাসা অসম্ভব। ভালবাসা ও প্রেমের কাছে বাহ্যিক সব আয়োজন গৌণ।
কাব্যগ্রন্থ: প্রেম
প্রকাশক: বইতরণী
তেরোই মাঘ
দিব্যেন্দু ঘোষ
সে এক কলোনি পাড়ার ছেলে
কবিতা লেখে জরাজীর্ণ শরীরে
সে উন্মাদ
সে পাগল
খিদের দেশে
সে এক কলোনি পাড়ার ছেলে
তাঁর জীবন অনিশ্চিত কবিতার ঘোরে
তবুও সে লেখে
লিখে চলে
মাঘের রোদ্দুরে
সে এক কলোনি পাড়ার ছেলে
আজীবন ডুবে থাকে বিভাস রাগের ঘোরে
সে এক কলোনি পাড়ার ছেলে
কাঁধে ঝোলা নিয়ে কবিতা ভিক্ষা করে
আশ্রমে আশ্রমে…
পরজন্মের জন্য স্বীকারোক্তি: জীবনসত্যের সন্ধান
কনক মণ্ডল
“ঋণ?
যদি মৃত্যুই শেষ সন্ন্যাসী হয়,
আমি থাকে
উদাসীন…”
কবি বিভাস রায়চৌধুরীর ‘পরজন্মের জন্য স্বীকারোক্তি’ কাব্যগ্রন্থে আমরা পাই তাঁর জীবনসত্য। যে জীবনসত্য পরজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে চান। উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তানের হৃদয়ে নব্বই দশকের যে অস্থিরতা এনেছিল তা এই কাব্যগ্রন্থটি পড়লে বোঝা যায়। ‘অপদেবতা জামা’ কবিতায় বাবার সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথন আমাদের সেই জীবনসত্যেরই সন্ধান দেয়। জ্ঞানী মনীষীদের মতো কিছু ঐশ্বরিক নির্দেশ রেখে যেতে চান না কবি। কবি শুধু তাঁর জীবনসত্যকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মকে জানিয়ে দিতে চান পাগলাঘণ্টি বাজিয়ে। ‘অপদেবতার জামা’ কবিতায় পরজন্মের সঙ্গে আমাদের সঙ্গে আমাদের সংযোগ করাচ্ছেন এইভাবে—
“বাতাসে ফুলের গন্ধ
ফুলে দেবাজের গন্ধ…
দেবরাজে আমার গন্ধ…
আর আমার গায়ে মৃত বাবাটির গন্ধ…”
‘বন্ধু’ তখনই সার্থক শব্দ যখন এই একাকারের ঝংকার থাকবে। এই কাব্যগ্রন্থটি তারই পরিচয়বাহী। যতই দ্বন্দ্ব থাকুক কবির কাছের বন্ধু তাঁর বাবা। মৃত্যুর পরও বারংবার বাবার সঙ্গী হতে চেয়েছেন—“বাবার না-নেভা চিতায় শুয়ে পড়লাম আমি…”। শুধু কি বাবার মৃত্যু যন্ত্রণা কবিকে এ পথে নিয়ে আসে? তা নয়। সময়ের অস্থিরতা কবিকে বিষণ্ণ করে তোলে, মুছে দিতে চায় উদ্বাস্তু, শরণার্থী কলঙ্ক। পরজন্মকে এই কলঙ্কিত অধ্যায়ের কথা বলে দেবেন কবি।
এক বাবা যায় আর এক বাবার জন্ম হয়। যে বাবার স্কন্ধে বর্তায় আর এক প্রজন্মকে বলে দেওয়া যেন তার পরজন্মকে স্বীকারোক্তি দিয়ে যায়। এই ‘স্বীকারোক্তি’ কথাটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ এই কাব্যগ্রন্থে। কবিতা পাঠ করতে করতে আমার মনে হল কবি প্রতিটি মানুষকেই বলছেন তুমিও তোমার পরজন্মকে স্বীকারোক্তি দিয়ে যাও। কারণ পরজন্মের স্বীকারোক্তিতে কোনও মিথ্যা থাকে না। থাকে না লোভ-লালসা-ভয়-অহংকার। কবির প্রতিটি মৃত্যুকে বাঁচিয়ে তোলে ‘শব্দ’। শব্দ নিয়ে খেলাটাকে দেবতা মনে করেছেন। শব্দ মরলে দেবতা মরে। দেবতা বাঁচলে শব্দ থাকে। আর শব্দ পরজন্মের কাছে তার স্বীকারোক্তি বয়ে নিয়ে যায়। এই দর্শনই কবি স্বতন্ত্রভাবে আমাদের বলেছেন।
“ঘুমোবার কিছু পরে যে মেঘ জমল, তাকে আজ কিছু কিছু
পরজন্মের কথা বলে যাই…”
কী বলতে চান কবি! কবির অনেক কথাই বলার থাকে। তা কাব্যগ্রন্থে বলেছেনও। দেশভাগ কবিকে কামড়ে ধরেন, কখনও-বা দেশভাগকে কবি কামড়াতে চান। প্রেমিকারা এই হৃদয়ের উত্তালের কথা বুঝতে না পারলে প্রেমিক কবি খ্যাপা ষাঁড়ের মতো বলেন—
“কোনদিন ভেবেছিস আমি সঙ্গমে অংশ নিলে আসলে অংশ নেয়
একটা ভাঙা দেশ, একটা ভাঙা গ্রাম?”
বন্যার জলে ডুবে যাওয়া সীমান্ত বিভাস রায়চৌধুরী দেখতে চাওয়ার কারণই হল বন্যায় কাঁটাতার দেখা যায় না। কবি যেখানে থেকে দেখতে চান বাবার খুলনা, মায়ের যশোর। এসব কথাই বলবেন পরজন্মকে। ‘পরজন্মের স্বীকারোক্তি’ কবিতার খণ্ডাংশ তুলে দেওয়া যাক এখানে—
“পরজন্মের জন্য স্বীকারোক্তি রেখে যাই
এক মেয়েকে ভালবেসেছিলাম, একটি লাইব্রেরির ভেতর
চুরি করেছিলাম কয়েকটা কবিতার প্রথম লাইন,
তারপর সে বিবাহ-দুর্বল হতেই আমি সব ঝেড়ে ফেলে
মন দিয়েছিলাম গদ্যে, আর
স্মাগলার-বন্ধুদের সঙ্গে মিশে বাংলাদেশে বিনে পয়সায়
পাচার করেছিলাম বেশ কিছু লিটল ম্যাগাজিন…
পরজন্মের জন্য স্বীকারোক্তি রেখে যাই
গোবরডাঙার পুরনো রাজবাড়ি আর আমবাগানের ভেতর
ঘুরেফিরে বেড়াতাম আমি,
এমনকী কুড়িয়েও পেতাম মাছরাঙার পালক,
বড়োসড়ো সাপের খোলস…”
জন্ম-জন্মান্তরের কাছে যে জীবনসত্যের ফসল রাখবেন বলে কবি ঠিক করেছেন সেখানে অক্ষরবৃত্তের ধারা চলিত ভাষার মতো সাবলীল। আরও অনেক কথা বলার আছে ‘পরজন্মের স্বীকারোক্তি’ নিয়ে। কোনও সংকলন বা পত্রিকায় সেগুলি লিখব। কবিকে প্রণাম।
ছাতিম গাছের ছেলে-বিভাস
অমর্ত্য বিশ্বাস
একটা প্রজন্মকে জড়িয়ে রাখা অভিধান জীবন সহিষ্ণুতাকে বড় করে দেখতে শেখায়। ছলনার জাল ছিড়ে বেরিয়ে আসে কিংভুত কবিতার দল। দামাল ছেলের চোখে হাজার কবিরা ক্ষুধার্ত ভাতের দানায় লাজুক হয়ে ওঠে। জীবনানন্দের মেয়ে সাক্ষী ছিল সে সব কিছুর। জলের ভেতর কুমিরবুড়ো আজন্মকাল উদ্বাস্তুদের নকশী কাটতে থাকে। স্বপ্ন দ্যাখে শিমুলভাষা, পলাশভাষা…
অনন্তকে খুঁজতে গিয়ে নষ্ট প্রজন্ম ভাসান নদী সাঁতরে নিশিজন্মের শব্দ করে ওঠে। চুপ থাকে বিভাস… ঋণ শরীর নিয়ে নববর্ষের শেষ প্রেমিকায় নৈবেদ্য ছিটিয়ে দেয় বাঙালের ছেলে। আমরা কখনো কী চণ্ডালিকাগাছ হব? নাকি বিষণ্ণ ঘোড়ার পিঠে পপিফুল হরপ্পা সভ্যতার দিকে আঙ্গুল তুলে দেখাবে আমাদের চোখ… একটি নদীর মৃত্যুর পর যখন ব্রিজ পেরোচ্ছে বনগাঁ লোকাল, তখন দেবতা হয়ে জন্ম নেয় গন্ধর্ব। চটুল নাচে উঠে আসে শালিক। আলো দেখায় পল্লীকবির লাজুক সত্য… ঘৃনা!
লক্ষ্য স্থির রাখলেই গোটা শূন্যের চুম্বন একদিন আমাদের ঘরে ঢুকবেই জানি… মাটি মেখে পাগল হবে কবিতা। আজ নতুন প্রজন্মের শরীর তোমাকে আয়ুর সংখ্যা মুছে তৈরি করুক মহাশূন্য। তুমি পাখি হও কবিতার…
জন্মদিনে বিভাসগাছ (এক শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন…)
‘অনন্ত আশ্রমে’র কবি বিভাস রায়চৌধুরী
অমিত সাহা
“এমন জন্মাব, যাতে গাছেদের আঘাত না লাগে
আকাশে পাখির ডানা স্বাভাবিক থাকে, এমন জন্মাব”
কবি বিভাস রায়চৌধুরী বাংলা কবিতার এক সৎ উচ্চারণ। তাঁর কবিতার ‘স্বাদ উচ্চাকাঙ্ক্ষাহীন’। কবির বিশ্বাস ‘পলাশ-জঙ্গল জুড়ে/ জীবনের দীক্ষা পড়ে আছে’, ‘মানুষ পতঙ্গ আর/ কবিতা ধারণামাত্র’। কবিতাময় জীবন তাঁর—‘চোখের জলের পাশে সারারাত দাবিহীন শুয়ে’ থাকা। তাঁর জীবন দর্শন এবং জীবনের প্রতি স্থির বিশ্বাস তাঁর কবিতাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তাই ‘কোপাই নদীর পাশে’ ‘একার চেয়েও একা পড়ে থাকে কবিতা-বিশ্বাস’। তিনি লিখেছেন ‘কবিতা বস্তুত এক অনিদ্রাসম্পদ’। এর চেয়ে বড় সত্যি কি হয়! কবির কাছে এবং পাঠকের কাছেও তাঁর কবিতা ‘অনিদ্রাসম্পদ’। আবহমান বাংলা কবিতায় ‘অনন্ত আশ্রম’ কাব্যগ্রন্থটি একটি মাইলস্টোন। জীবন অভিজ্ঞতা থেকে সঞ্জাত তাঁর লেখা। কবিতার কাছে আজীবন সৎ থাকার প্রচেষ্টা তাঁর। বিভাসদার কবিতায় থাকে আপাত সারল্যের আড়ালে গভীর দর্শন—যা তীব্র ব্যঞ্জনাময়। ভাব অনুয়ায়ী ছন্দের প্রয়োগ সর্বোপরি অক্ষরবৃত্তের তাঁর পঙ্ক্তি-বিন্যাস এবং স্পেশের ব্যবহারও বিশেষ সাংকেতিক। ‘মানুষ বোঝে না কিছু/ নদীকে জড়িয়ে কাঁদে নদীটির স্রোত…’। তাই তিনি যখন বলেন—‘যে-কোনও বাতাস জানি ছুটে যেতে যেতে/ হাউমাউ শূন্যে মিশে যায়,/ তার নাম ঝড়…’ ভাবি, ভাবতেই থাকি। কী ব্যাপ্তি! এই তো জীবন-বোধ!
প্রকৃতি তাঁর কবিতায় আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে। সেখানে বাস্তব থেকে পরাবাস্তবের উত্তরণ মুগ্ধ করে। চিরন্তন দর্শনের ভাব বহন করে—
“সমস্ত পুষ্পের ধীর সুস্থতার পাশে
নিজেকে গোপন করি
প্রকাশ্য হব না, এই হারিয়ে যাওয়া
আমাকে দিয়েছে এক বীজের জগৎ…
আলো খেয়ে একা থাকতে হয়…
আগামী জন্মের জন্য উদ্ভিদের মৃত্যু লিখি
মাটি থাকে সম্ভাবনাময়…”
আজ তাঁর সৎ উচ্চারণের পাশে নিশ্চুপ বসে থাকি—
“ভেবেছি পাগল কোনও
আনমনে স্বপ্ন রেখে যায়…
স্বপ্নের পেছনে ছুটি…
স্বপ্ন থেকে উঠে আসে দায়…
দায় এসে ঘণ্টা নাড়ে…
ঢং ঢং কবিতা আশ্রম…”
কবিতা আশ্রমের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগেই এই কবিতা পড়ে মানুষ বিভাস রায়চৌধুরীকে গোপনে ভালবেসে ফেলি। ‘কী এক রহস্য! দেখি/ সম্পর্ক দাঁড়িয়ে থাকে… আর/ জড়িয়ে-পড়ার নাম স্নান…’। তাঁর ‘প্রতিটি জখম জানে অশ্রু খেয়ে বাঁচে মফস্সল’। তাই নগর থেকে দূরে গ্রাম-মফস্সলের শক্তিশালী লেখকদের লেখা প্রকাশের দায় থেকে গড়ে তুলেছেন ‘কবিতা আশ্রম’। প্রণাম কবিতা আশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা কবি বিভাস রায়চৌধুরী। ভাল থাকুন। স্বপ্নে থাকুন।